জীবনের লক্ষ্য

জীবনের লক্ষ্য

শিরোনাম দেখে ছোটবেলায় স্কুলে লেখা ‘জীবনের লক্ষ্য’ রচনার কথা মনে পড়ে গেল, তাই না? আজব এই সিস্টেমে ‘সৃজনশীল’ প্রশ্ন যেমন কমন পড়ে, ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষার্থীদের নিজেকে ‘রচনা’ করতে বলা হলেও প্রায়ই তা মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লেখা হয়! ফলে শিক্ষার্থীর নয়, বরং সেগুলোতে গাইড বই প্রণেতাদের জীবনের লক্ষ্য প্রতিফলিত হওয়াই স্বাভাবিক। অবশ্য গাইডওয়ালাদের ভাবনায় বাজারের হালচাল অর্থাৎ সম্মানজনক, গ্রহণযোগ্য বা দামি বলে গণ্য পেশাগুলোর কথা প্রতিফলিত হয়ে থাকে। হয়তো সে কারণেই অধিকাংশের স্কুলজীবনের খাতা খুঁজলে দেখা যাবে হয় ডাক্তার নয়তো ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন!

যে মা-বাবা সন্তানকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর জন্য উদগ্রীব, তারা কি নিজেকে প্রশ্ন করেন—তাদের সন্তানের কেন ঠিক ওই পেশাতেই যাওয়া দরকার? সামাজিক স্বীকৃতি বেশি, তাই তো? সমাজ কেন স্বীকৃতি দেয়—বেশি আয়-রোজগার হয় বলে? অর্থ-সম্পদ তো অন্যান্য পথেও কামাই করা যায়। তাহলে তারা সেগুলোতে না হেঁটে বিশেষ কিছু পেশার দিকেই ছোটেন কেন? বলতে পারেন ‘মানুষের সেবা’ করার জন্য। যদি তাই হয়, তবে এখন কেন তারা সেই লক্ষ্য অর্জনের পর নিজ পেশায় উত্কর্ষ লাভের পরিবর্তে প্রশাসক বা পুলিশ কর্মকর্তা হবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছেন? ডাক্তারের চেয়ে প্রশাসকের কি মানবসেবার সুযোগ সাম্প্রতিককালে অনেক বেড়ে গেছে?

পোস্ট ক্রাইসিস বিজনেস

একসময় চারপাশের হাওয়া এমন ছিল যে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়াই বুঝি জীবনের চরম সফলতা। কিন্তু তারাও যখন (আমাদের শৈশবে পাঠ্যবইয়ের ফাঁকে ‘আউট বই’ পড়ার মতো) অন্যদের চোখ এড়িয়ে বিসিএস সহায়ক পুস্তক পড়ে, তখন মনে হয়, ছোটবেলা থেকে যে পেশায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন, সেটা মোটেই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না! মাঝেমধ্যে মনে প্রশ্ন জাগে—সত্যিই কি আমাদের ‘জীবনের লক্ষ্য’ বলে কিছু আছে? সে-সংক্রান্ত ভাবনাগুলো শেয়ার করতেই আজকের নিবন্ধ।

মাঝেমধ্যে ভাবি ক্ষুদ্র এই জীবনে অসংখ্য লক্ষ্যের ভিড়ে আমরা অধিকাংশই দিশেহারা নাবিকের মতো। ভারতবর্ষে পৌঁছার লক্ষ্যে বের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ গিয়ে হাজির হওয়ার দশা। শৈশব-কৈশোরে বিশেষ পেশায় যেতে আগ্রহীরা এখন কেউ হয়েছেন প্রশাসক, ব্যাংকার, শিক্ষক, সাংবাদিক নয়তো বেসরকারি খাতের বড় কর্তা। শুধু কি তাই? যাদের লক্ষ্য অর্জন হয়েছে, তারাও কি নিজ অর্জনে যথেষ্ট তৃপ্ত বোধ করেন? না, করেন না বলেই আবার নতুন নতুন লক্ষ্য স্থির করেন। সেগুলো অর্জনের জন্য অবিরাম ছুটতে থাকেন। দিন শেষে অনেক লক্ষ্যের পরিসমাপ্তি না দেখার কষ্ট নিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন! ফলে তথাকথিত ব্যর্থ ও সফলদের জীবনের শেষটাতে খুব একটা পার্থক্য হয় কি?

শিক্ষা স্বপ্ন ক্যারিয়ার
বর্তমান শিক্ষার্থীদের বইটি অবশ্যই পড়া উচিত…

তাহলে ঠিক কার সেট করা মানদণ্ডে আমাদের ‘সফলতা’, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে ‘জীবনের লক্ষ্য’ ঠিক করি? তাছাড়া যা অর্জন করতে চাই, তা কি নিজের চাওয়া? সত্যিই কি সেটা করতে ভালো লাগে? যদি না লাগে, তার পরও সেটা হবার বা করার জন্য আমরা নিরন্তর ছুটে চলি কেন? কারণ সমাজের চোখে আমরা সফল হতে চাই! কিন্তু দিন শেষে আমরা কি সমাজের সেই মানুষগুলোর সঙ্গে বসবাস করি? নাকি নিজের ক্ষুদ্র জগতে বারবার দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হতে হয়? যখন নিজের অব্যক্ত কষ্টগুলো পরিবারের সদস্যদেরও বলা যায় না, সেখানে সমাজের চোখে সফল হওয়া খুব কি দরকারি?

ক্ষুদ্র জীবনের অভিজ্ঞতা বলছে, আমরা যাদের ‘অসফল’ বলে মনে করি, তারা বরং অনেক তৃপ্তির জীবনযাপন করে। কারণ বাস্তবতা মাথায় রেখে তারা নিজেদের আকাঙ্ক্ষার ঝোলাটা ছোট করে। ফলে সামান্য কিছু দিয়েই তা পূরণ করা যায়। আর সেটা না হলেও শূন্য বা অপূর্ণ জায়গাটা খুব বেশি থাকে না। তাই তারা নিজেদের খুব একটা অসহায় ভাবে না। বড় অসুখ হলে নিয়তি ভেবে সৃষ্টিকর্তার হাতে নিজেকে সঁপে দেয়। আর সফলরা সারা জীবন নানাভাবে অর্জিত সব সম্পদ নিয়ে থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর দৌড়ায়। এমন একজনের দুই সপ্তাহের চিকিৎসা খরচ আড়াই কোটি টাকারও বেশি হওয়ায় একপর্যায়ে তার পরিবারকে অন্যদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হয়! তখন ভাবি দিন শেষে যেই লাউ সেই কদু। মাঝখানে দৌড়াদৌড়িই সার!

ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট বই
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

সফল মানুষদের জীবনে একেকটা লক্ষ্যের অর্জন আরো ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয় দেয়। প্রত্যাশিত ডিগ্রি-চাকরি-বিয়ের লক্ষ্য অর্জনের পর দম নেয়া বা সেটা উপভোগ করার ফুরসত মেলে না। তারা নতুন নতুন প্রকল্পে জড়িয়ে পড়ে। সেগুলো অর্জনে ছাত্রজীবনের চেয়েও কঠোর পরিশ্রম করতে থাকে। লাখ-কোটি-শতকোটি টাকার প্রকল্প তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। ফলে বাইরের লোকেরা অতিসফল মনে করলেও তারা নিজেরা সেটা ভাবে না। কারণ তাদের আইডলদের তুলনায় নিজেকে অতি ক্ষুদ্র বলে ভাবে। এমন বোধ তাদের এরই মধ্যে অর্জিত সফলতা ও সম্পদগুলো উপভোগ করার সুযোগটুকু দেয় না। বিরামহীন চেষ্টার ফাঁদে পড়ে নিত্যদিন ছুটতে থাকে। সহসা মুক্তির পথ মেলে না!

আপাতদৃষ্টিতে ‘সফল’ অনেকের কাছে জানতে চেয়েছি—নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছেন কিনা? তাদের জবাবের মূল সুর হলো, এরই মধ্যে বহুবার গোলপোস্ট বদলে গেছে। ফলে যা হতে চেয়েছিলেন হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছু হয়েছেন। কিন্তু খেলার মাঠে গোল করার যে তৃপ্তি, তা আর উদযাপন করা হয় না! বারবার গোলপোস্ট বদলে যাওয়ায় সারা মাঠ দাপিয়ে বেড়ালেও বিজয়ের স্বাদ উপভোগ করা যায় না। বিশেষ কোনো পেশায় যাওয়ায় সফলতার বোধ কালের আবর্তে বহু বদলে গেছে। এখন তার মানদণ্ড হয়েছে অর্থ ও ক্ষমতার দাপট। হয়তো সে কারণেই ঈর্ষণীয় পেশায় থেকেও তারা আবার রাজনীতিতে ঝুঁকছেন!

প্রত্যাশা ও সন্তুষ্টি
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

কিন্তু যে সফলতা অর্জনের জন্য আমরা মরিয়া হয়ে উঠি, তার ঠিক কতটা নিজেরা ভোগ করি? যদি তা না-ই করা যায়, তবে কাদের জন্য আমরা অন্যায়-অসৎ পথে হলেও সেগুলো অর্জনে ক্রেজি হয়ে উঠি? আমরা কেন বিশ্বাস করি যে আমার সন্তানেরা দুনিয়ার সবচেয়ে অযোগ্য-অপদার্থ হবে? আমি (প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি) অর্জন করে না গেলে তারা পথে বসবে? আমি সবকিছু অর্জনের দক্ষতা অর্জন করলেও তারা কিছুই করতে পারবে না—এমন ভাবনা আসে কেন? আমি বাবার চেয়ে বেশি অর্জন করার সামর্থ্য রাখলে আমার সন্তানেরা তার চেয়েও যোগ্য হবে—এমন চিন্তা আমাদের মাথায় আসে না কেন?

আসলে অন্যের সেট করে দেয়া স্কেল দিয়ে নিজের সফলতা মাপতে গেলে শুধু (পদ-পদবি, অর্থবিত্ত) অর্জনের দিকে মনোযোগ থাকে। বৈধ-অবৈধ নানা পন্থায় সেগুলো পেতে মরিয়া হয়ে উঠি। ফ্ল্যাট-গাড়ি-অলংকার, ব্যাংক-ব্যালান্স ইত্যাদি বাড়াতে বেপরোয়া হই। কিন্তু ঠিক তার কতটা আমাদের জীবদ্দশায় দরকার? নিজে কতটুকু ভোগ করে যেতে পারব—এমন আত্মজিজ্ঞাসার অবসর মেলে না। অথচ অন্যায়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি করে যে অর্থ সংগ্রহ ও পাচার করা হয়, তার পাপ কিংবা অপরাধের দায় কিন্তু পুরোপুরি আমার। ইউরোপ-আমেরিকার লোকেরা নিজের অর্জিত সম্পদ জীবদ্দশায় ভোগ করতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকে। আমাদের সমাজে সে প্রবণতাও নেই। তাহলে সম্পদ অর্জনের জন্য এমন পাগলপারা হওয়া ঠিক কতটা যৌক্তিক?

আমার দেখা মতে, বিপুল সম্পদ রেখে যাওয়া লোকদের অধিকাংশের সন্তানেরা ভালো জীবনযাপন  করে না। তাদের নানা অসৎ কর্মে জড়িয়ে পড়ার হারও তুলনামূলকভাবে বেশি। তাছাড়া পরিবারের একটা সন্তান জুয়া বা মাদকে আসক্ত হলে বাবা-মায়ের সারা জীবনে অর্জিত সম্পদ উড়িয়ে দিতে খুব একটা সময় লাগে না। এমনকি শেষ জীবনে অন্যের কৃপা নিয়ে বেঁচে থাকতেও দেখা যায়। তাই বিপুল পরিমাণ সম্পদ রেখে যাওয়া তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে, তার গ্যারান্টি কী?

উপেক্ষিত টিনএজ মার্কেট
বইগুলো সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন…

অনেকে ভাবতে পারেন, তাহলে আমি কি পরিশ্রম করতে বা সুযোগ থাকলেও অর্থবিত্ত অর্জনের বিপক্ষে বলছি। না, ব্যাপারটা তেমন নয়। আমাদের জীবন একটাই। অন্যদের চোখে সফল হতে গিয়ে নিজের মানসিক শান্তির জায়গাটা খুব ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকানো দরকার। সন্তানদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবিক হওয়ায় মনোযোগ না দিয়ে শুধু সম্পদের দিকে ছুটলে আপনার জানাজার নামাজে দাঁড়িয়েও তারা সম্পদ ভাগাভাগির হিসাব কষতে থাকবে। তাই সর্বপ্রথম নিজেদের প্রত্যাশায় লাগাম দেয়া দরকার।

জন্মের সময় সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে যে বিপুল সম্ভাবনা দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার সদ্ব্যবহারের লক্ষ্যে জ্ঞানার্জন করা দরকার। আমরা বাইরের সম্পদের পেছনে যেভাবে ছুটি, নিজের ভেতরের সম্পদের ব্যাপারে ঠিক ততটাই উদাসীন! কারণ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় ওই চিন্তা করাটা ঠিকমতো শেখায় না! এর পরও যারা শেখে, তারা স্বল্প অর্জনেও মানসিকভাবে তৃপ্ত থাকে। বস্তুগত সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও অন্তরে তৃপ্তির ঘাটতি হয় না।

তাই নিজে কষ্ট করে অর্জন করা সম্পদ জীবদ্দশায় সদ্ব্যবহারে সচেষ্ট থাকা উচিত। সন্তানদের অনুগ্রহের শিকার হওয়ার আগেই নিজের ভালো লাগা খাতে সেগুলো ব্যয় বা বিনিয়োগ করা দরকার। যদি সেগুলো স্রেফ দান করে মনে শান্তি লাগে, তবে সেটাই করা উচিত। আর সন্তানদের দক্ষ ও যোগ্য করে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে হবে। তাদের জীবনেও সফল হওয়ার দরকার আছে—এই বোধটা যথাযথভাবে তাদের ভেতরে জাগাতে হবে। সব সফলতা আমাকেই অর্জন করে যেতে হবে। আর পরবর্তী বংশধরেরা বসে বসে খাবে। এমন ভাবনা আমাদের ক্ষুদ্র জীবনকে বিষময় করে তোলা ছাড়া আহামরি কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও  ‘শিক্ষা স্বপ্ন ক্যারিয়ার’ বইয়ের লেখক। উৎস: বণিকবার্তা, ২৪ নভেম্বর ২০২০। লেখকের প্রাসঙ্গিক আরও একটি নিবন্ধ পড়তে দয়াকরে এখানে ক্লিক করুন

আপনার অন্তত একজন বন্ধুকে পাঠান, প্লিজ...

Follow Me

আপনার মস্তিষ্কের মালিকানা বুঝে নিন…

মস্তিষ্কের মালিকানা
error

আপনার “মস্তিষ্কের মালিকানা” বুঝে নিয়েছেন তো?

mahamid.biz@gmail.com
WhatsApp