বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা: একটি প্রস্তাব

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা: একটি প্রস্তাব

এ বছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা জড়িত। তাই অত্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি হ্যান্ডেল করতে হবে। এরই মধ্যে ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সদস্যরা একাধিকবার আলোচনা করেছেন। তারা নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য একটি উপায় খুঁজে বের করবেন। তবে বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি ধারণা উপস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হলে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এটাকে আরো সমৃদ্ধ এবং বাস্তবসম্মত করা যেতে পারে।

সর্বপ্রথম আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের একটি মেধাক্রম তৈরির জন্য। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অনুষদ বা বিভাগে পড়ালেখার জন্য একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় মেধা, দক্ষতা বা সক্ষমতা রয়েছে কিনা, সেটা যাচাই করা ভর্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্য থাকে না। তার প্রমাণ হলো, বিজ্ঞান শাখার একজন শিক্ষার্থী যখন হিসাববিজ্ঞান বা অর্থনীতি বিভাগে আবেদন করে, তখন কিন্তু তাকে (ভর্তি পরীক্ষায়) আবেদনকৃত বিষয়সংশ্লিষ্ট কোনো প্রশ্ন করা হয় না। বরং উচ্চ মাধ্যমিকে অধীত বিজ্ঞানের বিষয়গুলো থেকেই প্রশ্ন করা হয়। তাই এবারো ভর্তি পরীক্ষা নিতে হবে শুধু ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের একটি মেধাক্রম প্রণয়নের জন্য।

এই বিষয়ে আমরা একমত হতে পারলে সংশ্লিষ্ট বহু বিষয় তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যাবে। করোনার মতো মহামারী আমাদের অনেক বিষয়েই ছাড় দিতে শেখাচ্ছে কিংবা বাধ্য করছে। ফলে বৃহত্তর স্বার্থে এখানেও কিছু বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। তাছাড়া কোনো শিক্ষার্থীর অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয় কিংবা তারা বৈষম্যের শিকার না হয়, সেই বিষয়টাও খুব গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে করোনা পরিস্থিতিতে ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য নিম্নোক্ত প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্টদের বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি:

১. পরীক্ষার নাম: ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল অ্যাডমিশন টেস্ট (ইউসিএটি)।

২. ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।

৩. ভর্তি পরীক্ষার ইউনিট: তিনটি (বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা)।

৪. পরীক্ষার ধরন, সময় ও মান: এমসিকিউ টেস্ট, ২ ঘণ্টাব্যাপী, ২০০ নম্বরের পরীক্ষা।

৫. বিষয় বণ্টন: বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞানের সঙ্গে নিজ ডিসিপ্লিনের (৫টি বিকল্প হতে) যেকোনো দুটি বিষয়। প্রতি বিষয়ের নম্বর ৪০। অর্থাৎ ৪০*৫ = ২০০ নম্বর।

৬. ইউসিএটি বিজ্ঞপ্তি: আবেদনের জন্য ন্যূনতম সিজিপিএ নির্ধারণ করে ইউজিসি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। এইচএসসিতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য ৩ দশমিক ৫ এবং অন্যান্য শাখার জন্য ৩ সিজিপিএ চাওয়া যেতে পারে। সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বাসস্থানের নিকটবর্তী একটি কেন্দ্র চয়েস দেবে। নিকটস্থ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়ার ফলে পঞ্চগড়ের একজন শিক্ষার্থীকে (করোনা ঝুঁকি মাথায় নিয়ে) বরিশাল বা রাঙ্গামাটি ছুটতে হবে না। সে রংপুর বা দিনাজপুরে অবস্থিত একটি কেন্দ্রে পরীক্ষা দিলেই চলবে। প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ করে আবেদন প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পাদন করা খুবই সম্ভব।

দরকার, প্রয়োজন নাকি চাহিদা
অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন

৭. প্রশ্নপত্র প্রণয়ন: সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুষদের শিক্ষকদের কাছে প্রশ্নপত্র আহ্বান করা হবে। সেগুলোর মধ্য থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করবে। নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েক সেট প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা জরুরি।

৮. পরীক্ষা গ্রহণ: তিন ভিন্ন দিবসে তিন ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা হবে। এতে পরিবহন, আবাসন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চাপ ন্যূনতম হবে। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু একবার ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হবে। এর মাধ্যমে সে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় (মেধাক্রম অনুসারে) ভর্তি হওয়ার প্রাথমিক শর্ত পূরণ করবে।

৯. পরীক্ষা কেন্দ্র: সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গণ্য হবে। প্রয়োজনে (সংশ্লিষ্ট বিশ্বদ্যািলয়ের তত্ত্বাবধানে) নিকটবর্তী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজগুলোর সাহায্য নেয়া যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকমণ্ডলী পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

১০. উত্তরপত্র মূল্যায়ন: প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এর আগে যেভাবে নিজেদের ওএমআর শিটগুলো মূল্যায়ন করত, ঠিক সেভাবেই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রাথমিক স্কোর শিট তৈরি করবে। সেগুলো নিজেরা প্রকাশ না করে পুরো নম্বরপত্র ইউজিসির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠাবে। প্রতি কেন্দ্র থেকে সেন্ট্রাল ডাটাবেজে প্রাপ্ত নম্বরগুলো আপলোড করার ব্যবস্থা থাকলে কাজটা আরো সহজ হবে।

১১. ফলাফল প্রকাশ: ইউজিসির সেন্ট্রাল কমিটি সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ফলাফল একত্র করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের (তিনটি আলাদা ইউনিটে) র্যাংকিং প্রকাশ করবে। সেখানে পাস-ফেলের কোনো ব্যাপার থাকবে না। ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক শিক্ষার্থী কত করে নম্বর পেয়েছে, শুধু সেটার উল্লেখ থাকবে। এই অফিশিয়াল স্কোর ইউজিসি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবে এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় ওই মেধাক্রম অনুসরণের নির্দেশনা দেবে। পাশাপাশি প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার টাইমলাইনও বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ তখনই ঘোষণা করবে। সেটা করা গেলে শিক্ষার্থীদের ভার্সিটি ও সাবজেক্ট চয়েসের কাজটি তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট বই
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

১২. ভর্তি বিজ্ঞপ্তি: এবার প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় স্ব-স্ব বিধি মোতাবেক ছাত্র ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। সেখানে শুধু কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য ইউসিএটিতে ন্যূনতম কত স্কোর থাকতে হবে সেটা উল্লেখ করলেই আবেদনকারীর সংখ্যা কমে যাবে। তাছাড়া কোন ফ্যাকাল্টি/বিভাগে ভর্তির জন্য উচ্চ মাধ্যমিকে বিশেষ কোন সাবজেক্টে প্রত্যাশিত গ্রেড (যেমন ইংরেজি বিভাগে পড়তে আগ্রহীদের ইংরেজি বিষয়ে অন্তত ৩.৫ থাকার কথা) উল্লেখ করা যেতে পারে।

১৩. বাছাই পর্ব: ইউনিট, ফ্যাকাল্টি বা বিভাগওয়ারী (আগে যেভাবে মেধাতালিকা প্রকাশ করা হতো) প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্তদের তালিকা সেভাবেই প্রকাশ করবে। নির্দিষ্ট সময়ে তাদের মৌখিক পরীক্ষায় (সাবজেক্ট চয়েস ও মূল কাগজপত্র দেখানোর জন্য) ডাকা হবে। সেখানে উপস্থিত প্রার্থীদের মেধাক্রম অনুসারে ভর্তির জন্য সিলেকশন দেয়া হবে। যারা নির্দিষ্ট সময়ে হাজির (কিংবা ভর্তি) হবে না, তাদের মনোনয়ন বাতিল করে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের আহ্বান করা হবে। বিজ্ঞাপিত সব ক্রাইটেরিয়া পূরণকারীদের ভর্তির জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হবে।

১৪. চূড়ান্ত ভর্তি: ভাইভা বোর্ডের পাশেই বড় কোনো কক্ষে ওয়ানস্টপ সার্ভিস রাখতে হবে। সেখানে বিভাগ, ব্যাংক, হল, রেজিস্ট্রার অফিসসহ সব দপ্তরের ডেস্ক থাকবে। সেটা হলে একজন শিক্ষার্থী ন্যূনতম সময়ে তার ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাসায় ফিরতে পারবে। কারণ করোনা ভয়ে এবার আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই ভর্তিচ্ছু ও তাদের অভিভাবকদের বাসায় ঢুকতে দেবে না। ফলে যত কম সময়ে সম্ভব তাদের কাজ শেষ করতে হবে।

এই পদ্ধতিতে বাছাই করা হলে বিশেষায়িত (যেমন কৃষি বা প্রকৌশল) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও সমস্যা হওয়ার কথা না। তাছাড়া এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো র্যাংকিং করা হচ্ছে না। ফলে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া প্রায় আগের মতোই থাকবে। শুধু পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা হবে ইউজিসির তত্ত্বাবধানে। ফলে কাঠামো ও পদ্ধতিতে ব্যাপক কোনো পরিবর্তন আনতে হবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার আগেই ভর্তি পরীক্ষার স্কোর জানা থাকায় শিক্ষার্থীরা বড়জোর দুই বা তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেই ভর্তি হতে পারবে। তাতে অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের দেশব্যাপী চষে বেড়ানো, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় এবং টেনশন বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

কোন বিভাগে ভর্তির জন্য বিশেষায়িত পরীক্ষা (যেমন— স্থাপত্য বা চারুকলা) নেয়ার দরকার হলে মৌখিক পরীক্ষার আগেই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় এমন টেস্ট নিতে পারে। তাতে খুব সীমিতসংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশ নেবে। ফলে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেই সেগুলো নেয়া এবং মৌখিক পরীক্ষার আগেই ব্যবহারিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত স্কোর বাছাই বোর্ডের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। কিছু বিভাগে সব শাখা থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় (যেমন ব্যবসায় প্রশাসন) সেখানে আবেদনকৃতদের মধ্য থেকে সংশ্লিষ্ট শাখার সর্বোচ্চ স্কোরকারী (যেমন বিজ্ঞান শাখার মেধাক্রমে প্রথম ৩০ জন) শিক্ষার্থীই সিলেকশন পাবে। ফলে কোনো প্রকার জটিলতা হওয়ার কথা না।

তার পরও এত বিশাল এক কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করতে গেলে নানা সমস্যার উদ্ভব হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের এক্সপার্টরা এ ব্যাপারে মতামত দিয়ে ধারণাটিকে বাস্তবায়নযোগ্য করতে পারেন। পাঠকরা এ ব্যাপারে তাদের সুচিন্তিত মতামত দিয়ে ধারণাটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারেন।

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘শিক্ষা স্বপ্ন ক্যারিয়ার’ বইয়ের লেখক। উৎস: বণিকবার্তা, ২১ অক্টোবর ২০২০। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আরেকটি নিবন্ধ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Follow Me

error

করোনা সতর্কতায় কোন ছাড় নয়, প্লিজ