বিবিএ-এমবিএ ক্রেজ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

বিবিএ-এমবিএ ক্রেজ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

সম্প্রতি রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট আয়োজিত এক পাবলিক লেকচারে অংশ নিই। বাংলাদেশে নতুন ধারার ব্যবসায় শিক্ষার প্রথম প্রজন্মের একজন হওয়ায় আয়োজকরা আমাকে বিবিএ-এমবিএ ক্রেজ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা বিষয়ে বলতে অনুরোধ জানান। বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘বিবিএ-এমবিএ ক্রেজ: বাংলাদেশে ব্যবসায় শিক্ষার প্রবণতা ও গতিমুখ’। প্রদত্ত বক্তৃতার মূল ভাবনা শেয়ার করতে এই নিবন্ধ।

একসময় সাবজেক্ট হিসেবে ‘কমার্স’-এর তেমন কদর ছিল না! ফলে মেধাবীরা কমার্স পড়ত না বলেই ধারণা করা হতো।  জীবনে যারা কেরানি টাইপের চাকরিবাকরি করে দিনাতিপাত করার কথা ভাবত, তাদের পছন্দের বিষয় ছিল বাণিজ্য। তাছাড়া বিকম বা এমকম শব্দগুলো শুনলেও একটু ‘কম কম’ মনে হতো। ফলে সেগুলো নিয়ে মাঝেমধ্যে হাসাহাসিও হতো।

কিন্তু আমরা কলেজে পড়াকালে কেমন যেন একটু গুঞ্জন শুরু হয়। ব্যবসায় শিক্ষার মধ্যেও যে ‘বিশেষ কিছু’ রয়েছে, তা বছরখানেকের মধ্যে মোটামুটি চাউর হয়ে গেল। ফলে আমরা যখন অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হলাম তখন আর হীনম্মন্যতা থাকল না। বরং নিজেদের মধ্যেও একটু নাক উঁচু ভাব চলে এল। কারণ আমরা ছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী!

প্যাশন বনাম প্রফেশন…আমাদের দেশে বিদ্যার্জনে শিক্ষার্থীর প্যাশন বা সত্যিকারের ভালো লাগাকে কখনই আমলে নেয়া হয় না। সন্তান ভবিষ্যতে যেন করে-কর্মে খেতে পারে সে ভাবনা থেকেই ‘কোন বিষয়ে পড়বে’ তা মা-বাবা ঠিক করে দেন। ফলে চাকরির বাজারে হাওয়া বদলের সাথে সাথে অভিভাবকদের পছন্দের স্কেলও পরিবর্তন হয়। সেক্ষেত্রে প্রফেশনাল ডিগ্রিগুলোকে চিরদিনই অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কারণ সেক্ষেত্রে প্রত্যাশিত চাকরি না পেলেও তার রুটি-রুজি নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয় না।

ফলে শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা মেডিকেলে পড়ে ডাক্তার হওয়ার জন্য আর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে হয় ইঞ্জিনিয়ার। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—বিবিএ-এমবিএ পড়ে  কী হয়? যদি কর্মসংস্থানের বিষয়টা মুখ্য হতো তবে আমাদের অনেক বেশি সিএ, সিএমএ, সিএফএ, এমনকি এসিসিএ সম্পন্ন করা লোক দরকার। কই সেদিকে তো সেভাবে ঝুঁকছে না! কারণ কী? খুব সম্ভবত ‘তেলও কম ভাজাও মুচমুচে’ ভাবনাই আমাদের বিবিএ-এমবিএ ক্রেজ সৃষ্টির পালে হাওয়া দিয়েছে!

দরকার, প্রয়োজন নাকি চাহিদা
অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন

কিছুদিন আগে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রবেশপথে ডিউটিরত) সিকিউরিটি গার্ড বলল: স্যার, আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করবেন। ভাবলাম কোনো অসুখ-বিসুখ করেছে। পরে জানলাম, তার ছেলেকে ওই ভার্সিটির বিবিএ-তে ভর্তি করিয়েছে! তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা জানা থাকায় খুব বিস্ময় প্রকাশ করলাম। জবাবে সে বলল—স্যার, এখন থেকে আমি ডাবল শিফটে ডিউটি করব। প্রয়োজনে ধার-দেনা করব। তার পরও ছেলেটা যদি মানুষ হয়! তখন মনে প্রশ্ন জাগে—বিবিএ, এমবিএতে এমন কী শেখানো হবে, যা ওই বাবার দিনে ১৬ ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অর্জিত পয়সার বিনিময়ে ক্রয় করতে হবে?

গন্তব্যহীন পথচলাকেন আমরা বিবিএ-এমবিএ পড়াই? একজন শিক্ষার্থী জীবনের অতিমূল্যবান পাঁচটা বছর যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে, তা থেকে আমরা আসলে কী আউটপুট চাই? আরো স্পষ্ট করে বললে, সত্যিই কি আমরা কিছু চাই? যদি চেয়ে থাকি, তবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই কি সেটা জানে, অনুভব করে? আমার কাছে তা স্পষ্ট নয়।

কেন এটা সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার? তারা ওসব পড়া শেষে কী হবে: মালিক, কর্মকর্তা না কর্মচারী? সেটা নির্ধারণ হওয়া অত্যন্ত জরুরি এ কারণে যে ক্যাডার কর্মকর্তা তৈরির জন্য যে ট্রেনিং দেয়া হয়, একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তার জন্যও কি একই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়?

তাই প্রথমে তো লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। তার পরে পদ্ধতি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে চূড়ান্ত আউটকাম বিষয়ে অ্যাকটিভ স্টেকহোল্ডারদের অধিকাংশেরই ধারণা স্পষ্ট নয়। অভিভাবকরা এত কিছু বোঝার কথা না। তারা শুনেছেন বিবিএ-এমবিএ পড়লে চাকরি পাওয়া যায়, তাই সন্তানকে ভর্তি করেছেন, অকাতরে পয়সা ঢালছেন! আগের দিনের ‘নাইট স্কুল’ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকলেও যত্রতত্র চালু হওয়া ‘ইভিনিং এমবিএ’ সম্পর্কে আমরা বেশ পজিটিভ হয়ে গেছি—বিষয়টাতে ভাবনার খোরাক রয়েছে বৈকি।

গড্ডালিকা প্রবাহকখনো ভেবেছেন, স্বর্ণের দাম এত বেশি কেন? কারণ তার সাপ্লাই সীমাবদ্ধ। আমাদের দেশে বিবিএ-এমবিএ প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে কি তেমন কোনো চেষ্টা রয়েছে? প্রায় সব পাবলিক (এমনকি কৃষি বা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস পড়ানো হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো বিবিএ-এমবিএ ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। এরই মধ্যে বেশকিছু ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেছে। জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঠিক কত শিক্ষার্থীকে বিবিএ-এমবিএ পড়ানো হচ্ছে, তার পরিসংখ্যান অজানা!

এটা এমনই ট্রেন্ড হয়ে গেছে যে সন্তান কোথাও চান্স পায়নি—তাকে বিবিএতে ভর্তি করে দাও। একজনের ক্যারিয়ার থমকে আছে; প্রমোশন হচ্ছে না। কোথাও এমবিএ করে নাও। নিজের ডিগ্রির বহর লম্বা করতে চান, করে নিন একটা এমবিএ। অথবা বউকে চাকরিতে ঢোকানোর সুযোগ আছে কিন্তু তার যোগ্যতা নেই? নো প্রবলেম, একটা এমবিএ করিয়ে নেন।

এমনও দেখেছি, সন্তান বিদেশে বিবিএ পড়ছে। আর মা-বাবা দুজনই দেশে এমবিএ-তে ভর্তি হয়েছেন! অর্থাৎ পুরাই বিবিএ-এমবিএ পরিবার। কিন্তু তাদের নিজেদের কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য নেই, এমনকি ভবিষ্যতে করার ইচ্ছাও নেই! তার পরও কেন তাদের সেটা দরকার? নিতান্তই সোস্যাল স্ট্যাটাস বৃদ্ধির জন্য?

এই প্রশ্নগুলোর জবাব এ কারণে জানা দরকার যে আমাদের অফার করা প্রোগ্রামে কারা ভর্তি হচ্ছে, কেন পড়ছে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। নইলে হুজুগে বৃদ্ধি পাওয়া চাহিদা চুপসে যেতেও সময় লাগবে না। তারা আদৌ কিছু শিখছে কিনা, সে প্রশ্ন আজ বড় গৌণ হয়ে গেছে। বহু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিজিপিএ ফোর (আউট অব ফোর) নিয়েও চাকরি পাচ্ছে না। আবার নিজে একটা কিছু করবে সে আত্মবিশ্বাসও জন্মাচ্ছে না। ফলে এমন অসংখ্য বিজনেস গ্র্যাজুয়েট লইয়া আমরা কী করিব?

পদ্ধতি  বিষয়বস্তুসেই গতানুগতিক সিলেবাস, গত্বাঁধা লেকচার, অন্য দশটা বিভাগের মতোই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া… তার পরও এই ডিগ্রিগুলো বিশেষ হয় কী করে? হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল প্রত্যেক মডিউলে ৮০ ভাগ কেস সলিউশন, ১০ ভাগ বাস্তব অভিজ্ঞতা, আর ১০ ভাগ টিমওয়ার্কে বরাদ্দ রাখছে। আমাদের দেশে বহু প্রতিষ্ঠানে একটা কেস বা বাস্তব সমস্যার সাথে পরিচিত না হয়েও অনেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাচ্ছে!

তাছাড়া শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা বৃদ্ধির নেই কোনো উদ্যোগ। স্বতন্ত্র কোনো ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে না। বিশেষভাবে ডিজাইন করা ল্যাব বা ক্লাসরুমে শিক্ষণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয় না। সবই যদি গতানুগতিক হয়, তবে তা দ্বারা ‘বিশেষ পণ্য’ তৈরি হবে কী করে?

ক্লাসরুমের বাইরে কখনো (ব্যতিক্রম ছাড়া) কি শিক্ষার্থীদের পাঠানো হয়? তাদের কি বলা হয়, তুমি একটু বাস্তবে গিয়ে দেখো একটা ব্যবসা ঠিক কীভাবে চলে? সেখানে যারা সংশ্লিষ্ট রয়েছে, তাদের ভূমিকা কী এবং কেন? হ্যাঁ, শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ প্রথা চালু রয়েছে। কিন্তু তাকে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই।

প্রচলিত ইন্টার্নশিপে ঠিক কতটুকু ভ্যালু অ্যাড হয়, তা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয় পক্ষই কনফিউজড। এখনো ব্যাংকগুলোয় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপ করে। তারা মাসে ৫-৭ হাজার টাকা দেয়। ফলে অন্তত ২০ হাজার টাকার পরিশ্রম করিয়ে নেয়। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই ম্যানেজমেন্ট-সংশ্লিষ্ট নয়। বরং রুটিন ওয়ার্ক দিয়ে বসিয়ে রাখে। এই অভিজ্ঞতা সেই শিক্ষার্থীর জীবনে ঠিক কতটুকু ভ্যালু অ্যাড করে?

ব্যবসায় শিক্ষার্থীদের জন্য বই
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

ব্যবসায় শিক্ষার মূল লক্ষ্য যদি হতো ব্যবসায়ী তৈরি করা, তবে বাস্তবসম্মত অনেক উদ্যোগই নেয়া যেত। তিন দশক এক্ষেত্রে মোটেই কম সময় নয়। কিন্তু বস্তিবাসী যেমন হাফ ডজন শিশু জন্ম দিয়ে ছেড়ে দেয়—নিজের মতো করে-কর্মে খাও, আমরাও সেভাবে আনাচেকানাচে, যেখানে সেখানে বিবিএ-এমবি গ্র্যাজুয়েট প্রডিউস করছি। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মোটেই ভাবছি না!

প্রত্যাশা  বাস্তবতামেডিকেল, বুয়েট, বিএমএ, পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা (পুরো মেয়াদে) বিশেষ একটা কিছু অর্জনের লক্ষ্যে হন্যে হয়ে ছুটতে থাকে। যেদিন মিশন সম্পন্ন হয়, সেদিন সত্যি সত্যিই ‘একটা কিছু’ অর্জনের অনুভূতি তাদের আলোড়িত করে। বিবিএ-এমবিএর ক্ষেত্রেও কি তেমনটা হয়?

যদি তা না হয় বা কোনোভাবেই তাদের আন্দোলিত না করে, তবে তা ভাবনার বিষয় বটে। বিজনেস স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের ভেতরে কি সত্যিই তেমন কিছু অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জাগাতে পারছে? তারা কি একটা কিছু অর্জনের তাড়না অনুভব করে? নাকি নিতান্তই দায়ে পড়ে যতটুকু না করলেই নয়, সেই কাজটুকুই করে থাকে? তা দিয়ে কি বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাশা করা ঠিক?

অন্যদিকে নিয়োগকর্তারা যেসব গুণাবলি প্রত্যাশা করেন, গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে কি তার প্রতিফলন পাচ্ছেন? নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক। তাদের অভিযোগ, এখনকার (অধিকাংশ) বিজনেস গ্র্যাজুয়েট নিজ থেকে একটা বিজনেস প্ল্যান তৈরি করতে পারে না, মার্কেটিং প্ল্যান করার সাহস রাখে না, প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্যগুলো দিলে ব্যালান্স শিট মিলিয়ে দিতে পারে না। এমনকি একটা ট্রেড লাইসেন্স কীভাবে, কোথায় করতে হয়, তাও তারা জানে না। তার পরও এ বিষয়গুলোয় আমরা উদাসীন থাকছি।

অন্যভাবে বললে, এ ব্যাপারে ব্যাপক কোনো গবেষণা কি হয়েছে, যা থেকে আমরা গ্যাপগুলো চিহ্নিত করতে পারি। শিক্ষা ও ব্যবসায় নিয়ে যারা রিসার্চ করেন, তাদের মতামত কি কখনো জানতে চাওয়া হয়েছে? তাছাড়া দেশব্যাপী ব্যবসায় শিক্ষার এত বিপুল আয়োজন অথচ আমরা মোটাদাগে (গবেষণা বা কার্যক্রম দিয়ে) বিজনেস কমিউনিটির মনোযোগ আকর্ষণ কিংবা আস্থা অর্জন করতে পারিনি। বাস্তব সমস্যার সমাধানে তারা দেশের বিজনেস স্কুলগুলোর সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে না। 

এখনো যদি এ বিষয়গুলো আমরা অবজ্ঞা করতে থাকি, তবে আমাদের বিজনেস গ্র্যাজুয়েট ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অবশ্যই দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে। মোহভঙ্গ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল অবকাঠামো, হাজার হাজার শিক্ষক, লাখ-লাখ শিক্ষার্থী — সব আয়োজন হুমকির মুখে পড়বে না তো?

ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট বই
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

আমাদের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে মাঝেমধ্যে দু-একটা কথা বলেন। মাঝেমধ্যে সার্কুলার জারি করেন। বড় অনুষ্ঠান কিংবা টকশোতে কিছু কথা বলেন। তারপর অনেক দিন চুপচাপ। এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে অর্থবহ করতে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকা বা পদক্ষেপ নেয়া আর হয়ে ওঠে না। ফলে প্রচলিত কার্যক্রমের গুণগত মান বৃদ্ধির বিষয়টিও অগোচরেই থেকে যায়।

কর্মসংস্থানের বাঁকবদল…আমরা বোধহয় এটা খেয়ালই করছি না যে লেবার মার্কেট এরই মধ্যে গ্লোবাল হয়েছে। আমরা বিপুলসংখ্যক দক্ষ ও যোগ্য লোক তৈরি করতে পারলে সমস্যা নেই। তারা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু সেটা করতে ব্যর্থ হলে…আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে। আর বিদেশীরা এসে আমাদের কর্মক্ষেত্রগুলো দখল করে নেবে।

ছোট্ট এই দেশে এরই মধ্যে ১০ লাখের ওপরে বিদেশী কাজ করে? জেনে অবাক হবেন যে আমাদের প্রায় এক কোটি প্রবাসী প্রতি বছর যে পরিমাণ (১৫ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স পাঠায়, তার তিন ভাগের এক ভাগ অর্থ তারা নিয়ে যায় (প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯)! এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগকারী (নিয়োগকর্তা) আবেগের মূল্য দেবে না, যে তার কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবে, তাকেই নিয়োগ দেবে।

এক সময় জব সার্কুলারে বিবিএ, এমবিএ ডিগ্রির ব্যাপারে বিশেষভাবে উল্লেখ থাকত। নিয়োগকর্তারা প্রত্যাশা করেছিলেন, বিজনেস স্কুলগুলো চাকরিপ্রার্থীদের মোটামুটি তৈরি করেই দেবে। তারা প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ওরিয়েন্টেশন দিয়ে মাঠে নামিয়ে দেবেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রত্যাশার সাথে খাপ খায়নি। ফলে অনেকেই আবার প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন। ফলে বিশেষভাবে তৈরি হওয়া মার্কেটও হাতছাড়া হচ্ছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ প্রত্যাশামাফিক মসৃণ হচ্ছে না…

তাছাড়া আমার জানামতে, এখন পর্যন্ত বিবিএ-এমবিএ ডিগ্রিধারীদের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে ব্যাংকিং সেক্টরে। নানা কারণে এই খাত থমকে আছে। করোনার প্রভাবে বহু ব্যাংকে নানা অজুহাতে ছাঁটাই চলছে। ফলে ভবিষ্যতে তাদের নিয়োগ সংকুচিত হবে, সেটা সহজেই অনুমেয়। তাছাড়া এনজিও কিংবা উন্নয়ন সংস্থাগুলোও নানা কারণে নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে না।

ফলে বিবিএ-এমবিএ পড়া শেষে আবার অনেকেই ঝুঁকছে সেই সরকারি চাকরির দিকে। ফলে অনেকেই নিজ সাবজেক্টের পড়ালেখা বাদ দিয়ে বাংলা-গণিত-ইংরেজি-সাধারণ জ্ঞান পড়ায় মনোনিবেশ করেছে। এভাবে চলতে থাকলে উগান্ডার রাজধানী আর সাইপ্রাসের মুদ্রার নাম মুখস্থ রাখতে গিয়ে হিসাববিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী জার্নাল এন্ট্রি ও লেজার ভুলে যাবে! ফলে ডিগ্রির সাথে দক্ষতার ব্যাপক গরমিল হবে, যার ফল দীর্ঘমেয়াদে মোটেই ভালো হবে না।

পরিশেষেআমাদের বিজনেস স্কুলগুলোকে আগামী দিনের চাহিদা পূরণে যোগ্যতাসম্পন্ন (দক্ষ ও মানবিক) গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে। কারণ ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ হবে ভবিষ্যতের ব্যবসায় জগতে টিকে থাকার অপরিহার্য উপাদান। এত বিশাল আয়োজন করে যদি আমরা সে ব্যাপারে উদাসীন থাকি, তবে বিবিএ-এমবিএর ক্রেজ একসময় সংগত কারণেই ফিকে হয়ে যাবে। তাই সময় থাকতে আমাদের বোধ জাগ্রত হোক—এটাই প্রত্যাশা।

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক। উৎস: বণিকবার্তা, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০। লেখকের অনুমতি ব্যাতীত অন্য কোন মাধ্যমে এই লেখা ছাপানো যাবে না। প্রয়োজনে: E-mail: mahamid.biz@gmail.com

মধ্যবিত্তের শিক্ষা সংকট বিষয়ে লেখকের আরেকটি নিবন্ধ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Follow Me

error

করোনা সতর্কতায় কোন ছাড় নয়, প্লিজ