শিক্ষা নাকি পরীক্ষা!!!

শিক্ষা নাকি পরীক্ষা!!!

মানুষের জীবনে শিক্ষা নাকি পরীক্ষা– ঠিক কোনটা বেশি কাজের? জানি মুখে বলবেন, শিক্ষার কথা। তাহলে সবাই কেন পরীক্ষার পেছনে ছুটছে? এমনকি যে ফাইভ পাস সার্টিফিকেট দিয়ে পিওন পদেও চাকরির আবেদন করা যায় না তাতে জিপিএ ফাইভ পাওয়ার জন্য লোকে অস্থির হয় কেন? বাবা হয়ে সন্তানের জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সন্ধানে রাতভর ছুটে বেড়ায় কেন?

আমরা কী কখনো ভেবেছি: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেন দরকার? গৃহশিক্ষক রেখে পড়ালেখা করানোর সামর্থ্য থাকার পরেও মা-বাবা কেন সন্তানকে স্কুলে পাঠায়? কারণ প্রত্যাশা থাকে–সামাজিক জীব হিসাবে ভবিষ্যতে তাকে যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে– স্কুল সেগুলি দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করতে শেখাবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে একসময় সামগ্রিক কল্যাণ সাধনের জন্য যথেষ্ঠ যোগ্যরূপে গড়ে উঠবে। আর সেজন্যই বিশ্বব্যাপী মানুষকে লেখাপড়া শেখাবার এতো চেষ্টা বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

পরীক্ষা বা মূল্যায়ন হলো–এই প্রক্রিয়ারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। নির্দিষ্ট সময়ে একজন শিক্ষার্থী কাংখিত পর্যায়ের জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনে সমর্থ হয়েছে কি না–তা যাচাই করতেই পরীক্ষা পদ্ধতির উদ্ভব হয়। কিন্তু আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে সত্যিকার শেখা কিংবা দক্ষতা অর্জনের বিষয়টা একেবারে গৌণ হয়ে গেছে। যে শিক্ষার্থী মাথা না খাটিয়ে তোতাপাখির মতো মুখস্ত করে এবং জায়গা মতো যথাযথভাবে উদ্গীরণ করতে পারে (ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছে) তাকেই আমাদের সিস্টেম সবচেয়ে মেধাবী বলে গণ্য করে।

মধ্যবিত্তের শিক্ষা সংকট বিষয়ে পড়তে ক্লিক করুন এখানে

ফলে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি পঠিত বিষয়গুলোকে বাস্তবসম্মতভাবে চিন্তা করতে মোটেই উৎসাহ দেয় না; পরোক্ষভাবে অনুসন্ধিৎসু চেতনাকে ধ্বংস করে। ফলে একদিকে ভালো রেজাল্টধারীরা মুখস্ত নির্ভর হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে ভালো করতে পারে না। অপরদিকে তুলনামূলকভাবে খারাপ রেজাল্ট করায় সৃজনশীলদের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরে। ফলে পরীক্ষা পদ্ধতি জ্ঞানার্জনের সহায়ক না হয়ে বরং কালক্রমে শক্তিশালী এক প্রতিপক্ষরূপে আবির্ভূত হয়েছে!

সাধারণত প্রথমে নির্ধারণ করা হয় শিক্ষার লক্ষ্য, তারপরে সেটা অর্জনের পদ্ধতি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়– আমাদের দেশে আরবি পড়া (প্রকৃতপক্ষে ‘উচ্চারণ’) শেখা হয় সওয়াব লাভের আশায়। ফলে আরবীতে যা উচ্চারণ করা হয় তার অর্থ বোঝা কিংবা পঠিত বিষয়ের শিক্ষাটা বাস্তবজীবনে মেনে চলার কোনো প্রয়োজনই আমরা অনুভব করি না!

আবার ইংরেজি শিখতে চেষ্টা করি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার জন্য। তাই মুখস্ত কিংবা নকল করে যেভাবেই হোক পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারলেই জীবন ধন্য হয়! আর সে কারণেই বোধহয় বারো বছর বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজি পড়েও অধিকাংশ মানুষ দু’লাইন ঠিকমতো বলতে পারে না। অথচ সেই ব্যক্তিটিই যখন ইউরোপ বা আমেরিকায় যায়– বারো মাসেরও কম সময়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ করতে পারে! কারণ ঐ শেখার সাথে কোনো সার্টিফিকেট নয়–টিকে থাকার প্রশ্ন জড়িয়ে পড়ে।

ঠিক তেমনিভাবে, ছোটবেলা সাইকেল চালানো শেখার সময় রোদে-গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে যেতাম। সাঁতার শিখতে গিয়ে কতোবার পুকুরের পানি খেয়ে পেট ভরিয়েছি। হাইস্কুলে নাটকের রিহার্সেলে একই দৃশ্য দশবার চর্চা করেছি। এমনকি একবার কান্নার দৃশ্যে কোনভাবেই চোখে পানি আসছিল না দেখে বিরক্ত হয়ে (কাদিরাবাদ ক্যান্ট. পাবলিকের) ধীরাজ স্যার কষে এক চড় লাগালেন। কাঁদতে কাঁদতে যখন সংলাপ বলছিলাম তখন উপস্থিত সকলের হাততালিতে কষ্ট ভুলে গর্বে বুকটা ফুলে উঠেছিল।

এই কাজগুলো করতে গিয়ে কখনো বিরক্তি আসেনি। বরং আরেকটু মনোযোগী হলেই আরো দক্ষ হবো, ভালোভাবে বিষয়টা রপ্ত করতে পারবো–এই আকাঙ্খায় নিরলসভাবে চেষ্টা করে গেছি। কিন্তু একাডেমিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সেই অনভূতিটা একেবারেই আসে না কেন? সবগুলিইতো শিক্ষণ প্রক্রিয়ারই অংশ, তাই না? শিক্ষা নাকি পরীক্ষা– ঠিক কোনটা বেশি দরকারী তা এক গোলক ধাঁধাাঁই রয়ে গেল!

উৎস: লেখকের শিক্ষা স্বপ্ন ক্যারিয়ার বই থেকে সংকলিত। বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন এখানে…

আপনার অন্তত একজন বন্ধুকে পাঠান, প্লিজ...

Follow Me

আপনার মস্তিষ্কের মালিকানা বুঝে নিন…

মস্তিষ্কের মালিকানা
error

আপনার “মস্তিষ্কের মালিকানা” বুঝে নিয়েছেন তো?

mahamid.biz@gmail.com
WhatsApp