দরকার, প্রয়োজন নাকি চাহিদা…

দরকার, প্রয়োজন নাকি চাহিদা…

দরকার, প্রয়োজন নাকি চাহিদামো. আব্দুল হামিদ

Need বলতে আমরা কী বুঝব?

মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট কোর্সের প্রথম ক্লাসে মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা কেমন তা বুঝতে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলাম। সুকন্যা বেশ সাবলীলভাবে বলে উঠল– স্যার, একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা ব্যাখ্যা করি? সম্মতি পেয়ে সে শুরু করল…

— সকাল থেকে ক্লাস করে আমরা এখন বেশ ক্ষুধার্ত। এই ক্ষুধা নিবারণের জন্য একটা কিছু দরকার। সেটা বিস্কুট, সিঙ্গাড়া, নুডলস, বার্গার, এমনকি বিরিয়ানীও হতে পারে। ফলে এই যে ‘একটা কিছু’ যার মধ্যে ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা আছে– সেটাই মানুষের Need (দরকার).

ভালো বলেছ। তবে এই Need গুলো কী শুধু মানুষের ‘বেসিক নিড’ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে? জানতে চাইলাম।

— অবশ্যই স্যার। যে সকল বস্তু ছাড়া মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ে শুধুমাত্র সেগুলিরই Need ফিল করে। এ বিষয়ে বইয়ে খুব স্পষ্টভাবেই বলা আছে ‘the basic human requirements’.

দরকার, প্রয়োজন নাকি চাহিদা
অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন

ক্লাসের সবাই সুকন্যা’র সাথে একমত কি না জানতে চাইলে রিহা খুব দৃঢ়তার সাথে বলল…তার কথা আংশিক সত্য। তাছাড়া এবিষয়ে তার খুব বড় একটা ভুল ধারণা রয়েছে। বিষয়টা খোলাসা করতে রিহাকে অনুরোধ করলাম।

— কোন বস্তু মানুষের Need (দরকার) হবে কি না তার সাথে বাঁচা-মরা কিংবা অত্যাবশ্যক হবার কোন প্রশ্ন আদৌ জড়িত নয়– সে বলল।

তার মানে খুব অপ্রয়োজনীয় একটি পণ্যেরও Need থাকে? সেটা কীভাবে সম্ভব– আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

— স্যার, এ বিষয়ে প্রথমেই দ্বিমত পোষণ করব ‘অপ্রয়োজনীয়’ শব্দটি ব্যবহার প্রসঙ্গে। কেনাবেচা হওয়া কোন বস্তুই (ক্রেতার কাছে) অপ্রয়োজনীয় নয়! রিহা বলল।

তার মানে তুমি বলতে চাইছ ‘বিলাস দ্রব্য’গুলিরও Need রয়েছে? অথবা ফুটপাতে অনেক হকার যে তাবিজের মধ্যে মাটি ভরে বিক্রি করে সেটারও! তার কাছে জানতে চাইলাম।

– অবশ্যই রয়েছে। তা না থাকলে মানুষ নিজেদের কষ্ট করে আয় করা অর্থ দিয়ে সেগুলো কিনছে কেন?

তুমি কী উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা ব্যাখ্যা করবে? আমার ধারণা ক্লাসের অন্যরাও এবিষয়ে জানতে বেশ আগ্রহী ।

দরকার, প্রয়োজন নাকি চাহিদা

— চেষ্টা করছি স্যার। সেক্ষেত্রে এই শহরের নামকরা ব্যবসায়ী আলম সাহেবের কথা বলা যায়। শুনেছি কর্মজীবনের শুরুতে তিনি পায়ে হেঁটে আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে মুরগী সংগ্রহ করে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে সাপ্লাই দিতেন। কিছুদিন পরে একটা বাইসাইকেল কেনেন। ব্যবসায়ের পরিধি আরো বাড়লে ভ্যানগাড়ী কেনেন এবং নিজেই সেটা চালাতেন। সময়ের বিবর্তনে অন্যান্য ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন। দূর-দুরান্তে যাবার প্রয়োজনে এরপর একটা পুরাতন মোটরবাইক কেনেন। রিকন্ডিশন প্রাইভেট কারটি কেনার পূর্ব পর্যন্ত সেটাই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

এখন তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আমদানী-রপ্তানী ব্যবসাও বেশ জমে উঠেছে। শোনা যায় মাঝেমধ্যেই গাড়ীর মডেলও পাল্টাতে হয়। কিছুদিন আগে বিদেশী এক ক্লায়েন্ট তাঁর ফ্যাক্টরি ভিজিটে এসেছিলেন। অতিথিকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাবার প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে হলেও কোটি টাকায় লেটেস্ট মডেলের গাড়ী কিনেছেন! এখন প্রশ্ন হলো– মিস্টার আলমের জীবনে সাইকেল থেকে শুরু করে গাড়ীর এতো রূপ বদলালেও সবগুলো যানের মধ্যে একটা জায়গা কমন ছিল, সেটা কী?

অন্য কেউ রেসপন্স না করলে আমি বললাম– তুমিই বলো রিহা, আমরা শুনি।

— সেটা হলো ‘এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবার ক্ষমতা’!

— তুমি কি স্থানগত উপযোগ সৃষ্টির কথা বলছ?

— একদম তাই স্যার। গাড়ীর দরকার হয় এক জায়গা থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য। যে কোন গাড়ী নির্মাতাকে এই শর্তটি দক্ষতার সাথে পূরণ করতে হবে; অন্যান্য সকল বিবেচনা পরে। অন্তত একটা অভাব পূরণের মৌলিক ক্ষমতা থাকলে তবেই সেই বস্তুটার Need আমরা অনুভব করি– সে বলল।

ঠিক যেমন কলমের লেখার ক্ষমতা, পোশাকের লজ্জাস্থান ঢাকার ক্ষমতা, কিংবা টেলিভিশনের দূরবর্তীস্থানে ছবি প্রেরণ করার ক্ষমতা, তাই না? আমি বললাম।

— জ্বি স্যার। একটা কলম যদি সোনা দিয়ে তৈরি হয় কিংবা ডায়মন্ডদ্বারা সজ্জিত করা হয় তবুও মানুষ প্রথমেই জানতে চাইবে– সেটা দিয়ে লেখা কেমন হয়। লেখার ক্ষমতা যদি না থাকে কিংবা নিঃশেষ হয়ে যায়, সেটাকে শোপিস হিসাবে সাজিয়ে রেখে পাঁচ টাকার বলপেন খুঁজবে, লেখার কাজটি চালিয়ে নেবার জন্য। আশা করছি আমার ভাবনাটি ঠিকমতো তুলে ধরতে পেরেছি।

অবশ্যই পেরেছ। রিহা তোমাকে অনেক ধন্যবাদ বিষয়টি এভাবে চিন্তা ও শেয়ার করার জন্য।

শিক্ষা স্বপ্ন ক্যারিয়ার
বর্তমান শিক্ষার্থীদের বইটি অবশ্যই পড়া উচিত…

তোমরা কেউ কী বলতে পারবে নিডের সাথে Want (প্রয়োজন) এর পার্থক্যটা কোথায়? প্রশ্নটা শোনামাত্রই পল্টু বলে উঠল– স্যার, একটা বস্তুর মধ্যে যতো গুণই থাকুক না কেন আমি সেটা পেতে/কিনতে চাই কি না সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বার্গারের মধ্যে যতোই ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা থাক না কেন– আমি তা চাই না; বরং খিঁচুড়ি ভালো লাগে। তাই বার্গারের Want (প্রয়োজন) আমি অনুভব করি না!

কোন Need (যেমন ক্ষুধা) ফিল হবার পরে মানুষ কেন সাধারণত একটা নির্দিষ্ট বস্তু (পল্টুর ক্ষেত্রে খিঁচুড়ি) দিয়েই তা পূরণ করতে চায়– তোমরা কী সেটা কখনো ভেবেছ?

— কেন আবার? যার যেটা ভালো লাগে। যেমন কুচকুচে কালো মানুষেরা টকটকে লাল জিনিস পছন্দ করে! পল্টু বলল।

কেন ভালো লাগে? একজন চীনা নাগরিক নুডলস্, আমেরিকান বার্গার, আর বাঙ্গালী ভাত না পেলে (অন্য খাবারে ক্ষুধা মিটলেও) কেন যেন চুড়ান্ত তৃপ্তি পায় না। কে এটা ঠিক করে কার ক্ষেত্রে কোন বস্তুটা দিয়ে Need সবচেয়ে ভালোভাবে পূরণ হবে? সবার কাছে জানতে চাইলাম।

— সুকন্যা বলল: স্যার, সম্ভবত সেটা আমাদের ‘কালচার’।

ভালো বলেছ। একটা Need পূরণ করার বিকল্প অপশনগুলো যখন সামনে আসে তখন Professor Geert Hofstede এর মতে আমাদের মাথায় একটা সফটওয়্যার (software of the mind) সেগুলোকে দ্রুত স্ক্যান করতে থাকে। যে পণ্যের বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যক্তিগত রুচিবোধ, সামাজিক রীতি-নীতি, বিশ্বাস, বন্ধু বা পরিবারের মানুষের ঐবিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী ইত্যাদির সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়– সেটার প্রতিই আমরা ঝুঁকে পড়ি। ফলে বিদ্যমান সমাজ ও সংস্কৃতিই অধিকাংশক্ষেত্রে ঠিক করে দেয় আমরা ভাত খাব নাকি বার্গার।

এবার তাহলে বলো– যে বস্তু আমরা পেতে চাই বা প্রয়োজন (Want) অনুভব করি– তারই কী চাহিদা সৃষ্টি হলো বলে ধরা যাবে?

— অবশ্যই। সেজন্যইতো কোম্পানীগুলো দিনরাত বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাদের সুপ্ত আকাঙ্খাগুলো জাগাতে চেষ্টা করছে– পল্টু বলল।

— সুকন্যা একথার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, ক্লাসের ফাঁকে আমরা যখন মোবাইল ফোনের শোরুমগুলোতে ঘুরাঘুরি করি তখন অনেকেরই লেটেস্ট মডেলের আইফোনটি পেতে ইচ্ছা করে। এই ইচ্ছাকে বিবেচনায় নিয়ে বিক্রেতারা কী প্রচুর চাহিদা আছে ভেবে অনেক বেশি আইফোন মজুদ করে? তা করে না। তাই Want থাকলেই তা চাহিদা বলে ভুল করা যাবে না।

তাহলে আর কী কী বৈশিষ্ট্য যোগ হলে আমরা সেটাকে Demand (চাহিদা) বলতে পারব– রিহার কাছে জানতে চাইলাম।

— অর্থ ব্যয় করে পণ্যটা কেনার ইচ্ছা এবং প্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করার সামর্থ্য। কারণ কথায় বলে– টাকা থাকলেই হজ্জ্ব হয় না। অথবা গাছে বেল পাকিলে তাতে কাকের কী? রিহা বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।

একদম ঠিক বলেছ। এখন এই তিনটি ধারণাকে খুব সংক্ষেপে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে?

— স্যার, ভোগ থেকে বিরত থাকার ফলে আমাদের যে মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয় (যেমন: তৃষ্ণার্ত) তা থেকে উত্তরণের জন্য যা (পানীয়) পাওয়ার আকঙ্খা পোষণ করি– সেটা হলো Need. বিভিন্ন বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সেই দরকার পূরণে সুনির্দিষ্টভাবে যেটা পেতে চাই (হতে পারে জুস, শরবত, কোল্ড ড্রিংকস, অ্যালকোহল অথবা ঠান্ডা পানি) সেটা হলো Want. আর ক্রয়ের ইচ্ছা ও সামর্থ্যদ্বারা যখন সেই প্রয়োজনকে ব্যাকআপ দেওয়া হবে তখনি সেটার (পানি) Demand রয়েছে বলে ধরা যাবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করার জন্য তোমাদের সকলকে ধন্যবাদ। পরীক্ষার হল কিংবা ভাইভা বোর্ডের সামনে এই কথাগুলো মনে রেখে উত্তর দিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বহুলাংশে কমে যাবে।

নোট: সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের আক্রমণের পরে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার সময়  ‘চাহিদা’র সংজ্ঞায় আমার একটু খটকা লেগেছে। যদিও সেটা অর্থনীতিবিদগণ ফায়সালা করবেন। তবে যে বিষয়টা আমার দৃষ্টি কেড়েছে সেটা হলো– একজন ব্যক্তির বাসায় খাবার নাই। তার কেনার সামর্থ্যও নাই। সে বিশেষ সংস্থার একটা ফোন নম্বরে কল দিলেই তার বাসায় খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে একজন মার্কেটার হিসাবে আমার পণ্য বিক্রি হচ্ছে (পেমেন্ট কে করছে বা তার সামর্থ্য আছে কি না –সেটা মোটেই বড় বিবেচনা হওয়ার কারণ থাকছে না)! আর পণ্য বিক্রি হলেই মার্কেটার সেটার চাহিদা আছে বলে গণ্য করবে। আশাকরি ভবিষ্যতে এটা নিয়ে আরও কথা হবে এবং প্রয়োজনে Demand এর সংজ্ঞা সংশোধন করা হবে।

উৎস:  আলোচনাটি  মার্কেটিংয়ের সহজপাঠ বই থেকে নেওয়া হয়েছে। তরুণদের বিনোদন মার্কেট সম্পর্কিত বিশ্লেষণ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Follow Me

error

করোনা সতর্কতায় কোন ছাড় নয়, প্লিজ