ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ — ৮ (স্বপ্ন দেখুন লেগে থাকুন)

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ — ৮ (স্বপ্ন দেখুন লেগে থাকুন)

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ বিষয়ক আলোচনার অষ্টম পর্বে লেখকের পরামর্শ হলো — স্বপ্ন দেখুন লেগে থাকুন । পূর্ববর্তী পর্ব পড়তে ক্লিক করুন।

Asset # 8: Big Dreams and the Capacity to Live Them

আপনি মানুষটা কেমন– স্বপ্নবাজ নাকি ছোট্ট ঘর বেঁধে সেখানেই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পছন্দ করেন?

আচ্ছা, কখনো ভেবেছেন: ধনী পরিবারের অনেক সন্তান লেখাপড়ায় খুব একটা ভালো না করলেও ব্যবসা বা বড় প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনায় সক্ষম হয় কীভাবে? অপরদিকে, চিরদিন অভাবের মধ্যে বাস করা লোকেরা (সাধারণত) খুব বড় কিছু কল্পনাও করতে চেষ্টাও করে না কেন? এই প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে কিয়োসাকির খুব বিখ্যাত Rich Dad Poor Dad বইটা পড়তে পারেন। অসংখ্য ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।

আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ রয়েছে যারা আকস্মিক বড় কিছু করার পরিকল্পনা করে। পরক্ষণেই আবার তা ভুলে যায়। যেমন: বিসিএসের চূড়ান্ত রেজাল্ট হওয়ার পরে সদ্য অনার্স সম্পন্ন করা এক শিক্ষার্থী ভাবলো– নেক্সট বিসিএসে আমাকে সফল হতেই হবে। সেজন্য যত কষ্ট করা লাগে, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সব আমি করব। কাল সকাল থেকেই মিশন শুরু। সে মোতাবেক অ্যালার্ম সেট করে ঘুমাতে গেল। কিন্তু সকালে আর বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না! মোটামুটি সেই দিনের মধ্যেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা বেমালুম ভুলে যায়!

ব্যবসায় শিক্ষার্থীদের জন্য বই
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

এভাবে দৈনন্দিন জীবনে আমরা অসংখ্য বিষয়ে ভাবি কিন্তু তা আর বাস্তবায়ন করা হয় না। অনেকে মজা করে এমন অবস্থাকে বলেন: পরিকল্পনার ‘পরি’ উড়ে গেছে; রয়ে গেছে শুধু কল্পনা! এমন আকাশ-কুসুম কল্পনা কী আদৌ আপনাকে সাহায্য করতে পারবে? অবশ্যই না। এবিষয়ে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের সেই উক্তি স্মর্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’ লেখক ব্যবসায়ের অষ্টম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিষয়ে বলেছেন: বড় স্বপ্ন দেখুন লেগে থাকুন।

তাই শুধু স্বপ্ন দেখা নয় বরং তার বাস্তবায়নে নিজেকে তৈরি করা, ধৈর্য সহকারে তাতে অবিচল থাকা, ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিহত করার মাধ্যমেই সফল হওয়া যায়। কিন্তু যারা শর্টকাটে সফল হবার পন্থা খোঁজেন তাদের জন্য শুধু কল্পনাই থাকে, বাস্তবে তেমন কিছু অর্জিত হয় না। শাহরুখ খান বলিউডে একটা পজিশন পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস, বছরের পর বছর লেগে ছিলেন। কেউ তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। কারণ নজরকাড়ার মতো না ছিল চেহারা, না ছিল লক্ষণীয় গুণাবলী। কিন্তু তিনি নিজেকে স্বপ্নের জায়গায় নেওয়ার জন্য দীর্ঘ দিন লেগে ছিলেন– একসময় চরম সাফল্য তার হাতে ধরা দেয়।

এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছে যারা জীবনের একটা পর্যায়ে যা হতে চেয়েছিলেন, চারপাশের মানুষ তা শুনে হেসেছে। তাকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করেছে। কিন্তু দক্ষতার সাথে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে কাজ করার মাধ্যমে তারা একসময় ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছেন। তাই জীবনে স্বপ্ন দেখা ও তার বাস্তবায়নে নিরলসভাবে লেগে থাকাটা জরুরি। এক্ষেত্রে লেখক মোট পাঁচ ধরণের স্বপ্নবাজের কথা ব্যাখ্যা করেছেন। খুব সংক্ষেপে সেগুলো তুলে ধরছি:

১. অতীতের স্বপ্নে বিভোর: এই মানুষগুলো মনে করে তাদের জীবনের বেস্ট অর্জন ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। এখন আর কিছুই করার নেই। অথবা এখন আর গুণী লোকের কদর নাই! দুনিয়াটা জাহান্নাম হয়ে যাচ্ছে। ফলে যে কোন আড্ডা বা আলোচনায় সুযোগ পেলেই তারা নিজেদের স্কুল জীবনে কেমন ফুটবল খেলত বা কলেজে কেমন নেতা ছিল– সেটা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে। তারা সামনের দিনগুলোতে আর কোন আশার আলো দেখে না। ফলে জীবন্মৃত হয়ে দিন কাটাতে থাকে।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের বইটি অবশ্যই পড়া উচিত…

২. খুব ছোট্ট স্বপ্নকে আঁকড়ে যারা বাঁচে: এই শ্রেণির লোকেরা ধরেই নেয় যে, তারা বড় কিছু করার সামর্থ্য রাখে না। তাই ওসব আকাশ-পাতাল ভাবাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। তারা সবসময় নিজের সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে কাজের পরিকল্পনা করে। যদি কখনো সামান্য ঝুঁকির উদ্ভব হয়, তখনই তারা আবার পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে। এভাবে নিজের ক্ষুদ্র পরিমন্ডলেই তারা সুখী থাকতে চেষ্টা করে। এই মানুষগুলো প্রায়শ আত্মকেন্দ্রীক হয়। কোনরকমে টিকে থাকাকেই জীবনের সার্থকতা বলে গণ্য করে।

৩. স্বপ্ন অর্জনের পর তা ভোগ করতে থাকে: এই গোষ্ঠী জীবনে এক বা দুইটা বড় স্বপ্ন দেখে। তারপর সেটা অর্জন হয়ে গেলে বাঁকী জীবন আর নতুন কিছু নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে চায় না। যেমন: ছাত্রজীবনে হয়ত স্বপ্ন দেখলো– ভালো রেজাল্ট করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। তার জন্য একটানা কয়েক বছর কঠোর পরিশ্রম করলো। সেটা অর্জন হবার পরে সে ভাবলো– আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নাই। অথবা একজন স্বপ্ন দেখলো– বিসিএস ক্যাডার হবে এবং স্বপ্নের মানুষটিকে বিয়ে করবে। এর জন্য কয়েকবছর অমানুষিক পরিশ্রম করলো। দুটোই অর্জন হলো। এবার সে তা উপভোগ করতে শুরু করলো।

আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টা ভালোই লাগছে। কিন্তু সমস্যা হলো– মানুষের স্বপ্ন দেখা যদি থেমে যায়; তাহলে খুব দ্রুতই জীবনকে বোরিং মনে হয়। সব থাকার পরেও এক শূন্যতা তাকে গ্রাস করতে থাকে। জাস্ট ভাবুন: মাত্র ২৬/২৭ বছর বয়সেই তার বড় চাওয়া দুটোই পূরণ হয়ে গেল। তাহলে সে যে আরও ৪০/৫০ বছর বাঁচবে, কী নিয়ে? তাই যারা মনে করেন, বড় অর্জন হয়ে গেলেই আমি তা উপভোগ করতে থাকব। বাস্তবে সেটা হয় না। কারণ– ফাইভ স্টার হোটেলে যদি কোন কাজ বা দায়িত্ব ছাড়া আপনার বছরের পর বছর থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়– আমার ধারণা আপনি খুব শীঘ্রই হাঁপিয়ে উঠবেন। আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ এই সমস্যায় প্রবলভাবে ভূগছে! বাহ্যিকভাবে তারা সফল কিন্তু মনে সুখ নাই।

৪. বাস্তবমূখী পরিকল্পনা ছাড়াই বড় স্বপ্ন দেখে: ছোটবেলা থেকে চারপাশে এমন অসংখ্য মানুষ দেখেছি যারা বড় কিছু হবার বা বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা বা দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী নয়। তাদের ভাবখানা এমন যে, অন্য লোকেরা সব কিছু তৈরি করে তাদের সুসজ্জিত অফিসকক্ষে বসিয়ে দেবে। আর তারা নিজেদের পারফরমেন্স দিয়ে ফাটিয়ে ফেলবে! সত্যিই কী তেমনটা হয়? সম্পদ সংগ্রহ, তার সুরক্ষা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা রাতারাতি শেখার মতো বিষয় নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী চর্চা লাগে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও ঠেকে শেখার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেজন্যই সচেতন ব্যবসায়ীরা তাদের সন্তানদের ছোট ছোট প্রজেক্টে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেন। তারা সেখানে নিজেদের পরিকল্পনা প্রয়োগ করে নানা জ্ঞান অর্জন করে। আপাতত ভুল করলেও পরবর্তীতে সেই শিক্ষা বিশেষভাবে সাহায্য করে।

৫. বড় স্বপ্ন দেখে এবং সেটার বাস্তবায়নে কাজ করে, একটা অর্জন হলে আরেকটা বড় স্বপ্ন দেখে: জীবনকে সত্যিকার গতিশীল রাখতে এই চর্চাটা জরুরি। কারণ মানুষের জীবনে ক্রমেই একটা করে স্বপ্ন অর্জন হবার পরে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস ও সক্ষমতা জন্মে। ফলে একজন সাধারণ চাকরিজীবী যেখানে ১০ লাখ টাকার সিদ্ধান্ত নিতে শতবার ভাবেন সেখানে একজন ব্যবসায়ী কোটি টাকার প্রজেক্ট অনায়াসে হাতে নেওয়ার সাহস রাখেন।  এক্ষেত্রে মানুষ যাদের সাথে মেশে তাদের মনোভাব, কাজের ধরণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াদ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। জীবনকে গতিশীল রাখতে এই বিষয়টা খেয়াল রাখা জরুরি। চারপাশে এনার্জি কিলার লোকজন থাকলে আপনি কোনভাবেই বড় কিছু করতে পারবেন না। তারা বন্ধুর বেশে আপনাকে পিছু টেনে ধরবে!

মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সারাজীবন স্বপ্নের পেছনেই ছুটব– তাহলে অর্জনটা ভোগ করব কখন? আসলে সমগ্রজীবন এমন এক জার্নি যাতে চলার পথেই আপনাকে উপভোগের কাজটাও চালিয়ে যেতে হবে। আপনি হয়ত ভাবছেন: রিটায়ারমেন্টের পর সব আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ঘুরতে যাবেন, দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করবেন, হজ করবেন…ইত্যাদি। কিন্তু কখনো ভেবেছেন কী– যাদের কাছে বেড়াতে যেতে চান, তারা ততদিনে বেঁচে থাকবে তো? ঘুরতে যাবেন ভালো কথা কিন্তু ততদিন আপনি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকবেন তো? হজ করবেন– ততদিন বেঁচে থাকবেন তো? এর কোনটারই সদুত্তর নাই। ফলে জীবনে চূড়ান্ত কোন গন্তব্য বলে কিছু নেই। পুরো জার্নিটার নামই জীবন। তাই স্বপ্ন দেখতে হবে, সেটা অর্জনে সচেষ্ট থাকতে হবে– আবার সেটা উপভোগও করতে হবে!

দীর্ঘ এই বই আলোচনা এই পবেই সমাপ্ত হলো। ধৈর্য ধরে সবগুলো পর্ব পড়ার জন্য আপনাকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। © Md. Abdul Hamid (মো. আব্দুল হামিদ)। লেখকের অনুমতি ছাড়া এই সাইটের লেখা অন্য কোন মিডিয়ায় প্রকাশ করা যাবে না।

Follow Me

error

করোনা সতর্কতায় কোন ছাড় নয়, প্লিজ