ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ — ৭

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ — ৭

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ বিষয়ক আলোচনার সপ্তম পর্ব। আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

Asset # 7 : A Mechanism for Genuine Wealth Creation

লোকে বলে, বসে খেলে রাজার ভান্ডারও ফুরিয়ে যায়। তাই জীবনকে গতিশীল রাখতে নিয়মিত ইনকাম জেনারেট হয়– এমন দিকে আমরা মনোযোগী থাকি। কিন্তু ‘আয়’ ও ‘সম্পদ’ এই দুটো বিষয়ের মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। নিয়মিত আয় হওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু তাকে সম্পদ সৃষ্টির ধারায় অন্তর্ভূক্ত করতে না পারলে যে কোন সময় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কারণ যে কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনা থেকে আয় আসা বন্ধ হতেই পারে। তাই সুসময়ে যত অল্প পরিমাণই হোক না কেন, নিয়মিত বিনিয়োগ করার চর্চা থাকলে তা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্ন দিতে থাকবে।

এ-ব্যাপারে বইটির লেখক আমেরিকার সাবেক দু’জন প্রেসিডেন্টের উদাহরণ দিয়েছেন। জন্মসূত্রে থমাস জেফারসন ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান। হাজার হাজার একর জমির মালিক ছিলেন তার পূর্ব পুরুষেরা। অপরদিকে, জন অ্যাডামস তুলনামূলকভাবে এক গরীব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি ম্যাসাচুয়েটসে ব্যারিস্টারি করতেন। তাদের দু’জনই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে (অ্যাডামস-দ্বিতীয় ও জেফারসন-তৃতীয়) মার্কিন প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন।

বিস্ময়কর ভাবে দু’জন একই দিনে মারা যান। ধনীর দুলাল জেফারসন একলক্ষ ডলার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। অপরদিকে, দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণকারী অ্যাডামসের মৃত্যুর সময় সম্পদের পরিমাণ ছিল একলক্ষ ডলারেরও বেশি! কেন এমনটা হলো? কারণ অর্থ সংগ্রহ, ব্যয়, ও বিনিয়োগের প্রতি দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গী ছিল ঠিক বিপরীত। যা তাদের পুরো জীবনযাপন ও কাজের ধরনে প্রকাশিত হয়েছে।

আমাদের চারপাশেও এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বিশেষত মা-বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে না পারায় অসংখ্য মানুষ দেওলিয়া হয়। জীবনের শেষের দিকে ঋণগ্রস্থ হয়ে দুনিয়া ছাড়ে। এক্ষেত্রে বইটির লেখকের পরামর্শ হলো: যত সম্পদেরই মালিক হোন না কেন। নিয়মিত আয় আসে এমন খাতে বিনিয়োগ করুন। এই চাকা থামানো যাবে না। সেটা হলে বুঝতে হবে– সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

তাছাড়া অর্থসম্পদ এই দুইয়ের পার্থক্য খুব ভালো করে বুঝতে হবে। অর্থ (টাকা) দিয়ে একবারই কেনা যায়। অথচ সম্পদ বারংবার কেনার পথ সুগম করে। গল্পের সেই সোনার ডিম দেওয়া রাজহাঁস ছিল– কৃষকের সম্পদ। আবার কেউ একটা গাভী কিনে যদি জবাই করে তার মাংস বিক্রি করতে চায় তবে তা থেকে শুধু একবার সুবিধা পাবে। কিন্তু তার যত্ন নিলে প্রতিবছর বাচ্চা দেবে, নিয়মিত দুধ দেবে আর মূল সম্পদ গাভীটাতো থাকবেই। তাই অর্থের চেয়ে ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ বৃদ্ধির ব্যাপারে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।

এ-ব্যাপারে ওয়ারেন বাফেটের এক শিক্ষা গল্প আকারে চালু আছে। সেটা হলো: এক জন্মদিনে তার নাতি একটা আইফোন কিনে দেবার জন্য আবদার করে। তিনি ভাবলেন, সারাজীবনের জন্য নাতিকে একটা শিক্ষা দেওয়া যাক। তিনি কাঙ্ক্ষিত ফোনটির দাম জানতে চাইলেন। পরের দিন এক ভালো কোম্পানির শেয়ার (উল্লেখিত অ্যামাউন্টের) কিনে নাতিকে উপহার দিলেন। আর বললেন, সেই বিনিয়োগের আয় দিয়ে পরের বছর সে এর চেয়ে লেটেস্ট মডেলের আইফোন কিনতে পারবে। বাস্তবে সেটাই হলো। নাতি এই ঘটনা থেকে শিখল: মূলধন ঠিক রেখে কীভাবে বছরের পর বছর তার মুনাফা ভোগ করতে হয়!

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ
বিস্তারিত জানতে ছবির ওপর ক্লিক করুন

যাহোক, যখন কেউ কষ্ট করে তিলে তিলে অর্থ সঞ্চয় করে অর্থের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গী; আর যে হঠাৎ করেই অনেক টাকা পেয়ে যায়– দু’জনের মনোভাব কখনো একইরকম হয় না। লটারিতে ৪০ লাখ টাকা জেতা কিংবা রিয়েলিটি শো-তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি পাওয়া কয়জন– সেটা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারে? কেন পারে না? কারণ বিনা কষ্টে পাওয়া বস্তুর প্রতি দরদ স্বভাবতই কম থাকে। তাছাড়া সেটা ম্যানেজ করার ক্ষমতাও রাতারাতি গড়ে ওঠে না।

হয়ত এ-কারণেই সম্পদের প্রতি পিতা ও সন্তানের দৃষ্টিভঙ্গীতে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। লেখকের মতে, অতি সফল মানুষেরা ‘আয়’ বাড়ানোর জন্য কাজ করেন না; তারা ব্যবসায়ের প্রকৃত ‘সম্পদ’ বাড়াতে মনোযোগী থাকেন। এতে নিজের কল্যাণের পাশাপাশি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার হয়; কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ নানা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিয়োসাকি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রকৃত সম্পদ বাড়ানোর জন্য চারটি ধাপ অনুসরণের প্রস্তাব দিয়েছেন। সেগুলো হলো:

১. Build a business: যত ক্ষুদ্রই হোক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে হবে। ব্যবসা হলো সন্তানের মতো। সময় নিয়ে যত্ন করে তাকে গড়ে তুলতে হয়। রাতারাতি ফল পাওয়া যায় না। আন্তরিকতা, সততা, দক্ষতা দিয়ে তাকে সর্বোত্তম উপায়ে গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকতে হয়। যখন সেটা ম্যাচিউরড হয় তখন তা থেকে অনেক বেশি রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। সেটা আয় না বাড়ালেও সম্পদ বাড়ায়! তাই প্রথম কাজ হলো: ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

২. Reinvest in your business: ব্যবসায় থেকে প্রাপ্ত মুনাফা পুরোপুরি ভোগ না করে যতটা সম্ভব পুনরায় বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ সেটা করলে ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ বাড়বে জ্যামিতিক হারে। একটানা কয়েক বছর যদি মুনাফা রি-ইনভেস্ট করা যায় তবে তা মহীরুহে পরিণত হবে। আর সেটা না করে গাছের ডালপালা ছেঁটে ফেলার মতো মুনাফা ভোগ করে ফেললে তা গা-গতরে খুব একটা বাড়তে পারে না।

অনেকে আবার অন্য পেশার পাশাপাশি ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করে সফলতা পেলে দ্রুতই আগের কাজটি বন্ধ করে দেন। অর্থাৎ একক আয়ে মনোযোগী হন। এতে ঝুঁকির মাত্রা বাড়ে। ব্যবসায় থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করতে থাকলে পুনরায় বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তখন তার প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ হয় না। আর সে জন্যই বলা হয়: The reason so many people fail to achieve great wealth in any business is simply that they fail to reinvest continually in the business.

৩. Invest in real estate: আমেরিকান প্রেক্ষাপটে লেখকের পরের পরামর্শ হলো রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ করা। তাতে একদিকে বাসা-অফিস ভাড়া দেওয়ার দুশ্চিন্তা কমবে। অন্যদিকে, সেটা (সুযোগ থাকলে) ভাড়া দিয়ে আয় করার ক্ষেত্রও তৈরি হবে। ফলে ধীরস্থির ভাবে পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন করা যাবে। বড় কোন সমস্যায় পড়লে সেটা বিক্রি করে আর্থিক সাপোর্টও পাওয়া যাবে। তবে এই খাতে মনোযোগী হবার প্রধান লক্ষ্য বিক্রি থেকে অর্থ পাওয়া নয়, বরং গাইয়ের দুধ দোওয়ার মতো নিয়মিত সুবিধা পাওয়া।

৪. Let your assets buy luxuries: হঠাৎ অর্থের সরবরাহ বেড়ে গেলে অনেকেই বিলাসিতায় মত্ত হন। বাসস্থানের পেছনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বৃদ্ধি, গাড়ির মডেল বদলানো, নানা অজুহাতে মেগা-পার্টির আয়োজন…এমন অসংখ্য খাতে ব্যয় বাড়াতে থাকে। অথচ দীর্ঘদিন থেকে ব্যবসায়ে লেগে থাকা মানুষগুলো অনেক আর্থিক সমৃদ্ধির পরেও জীবনযাপনের ব্যয় খুব একটা বাড়ান না। ফলে তাদের ব্যবসায়ের সমৃদ্ধি ঘটতে থাকে।

অপরদিকে, নব্য সফল ব্যবসায়ীরা বিলাসদ্রব্যের পেছনে ব্যয় বাড়াতে থাকেন। লেখক পরের এই ধারাকে অনুৎসাহিত করেছেন। তার মতে, নিজের ব্যক্তিজীবনে বিলাসিতা না বাড়িয়ে আপনার ব্যবসায় উদ্যোগকে বিলাসী হতে দিন। বড় বিনিয়োগ, মেগা আয়োজন করুন ব্যবসার প্রয়োজনে, ব্যক্তিগত খাতে নয়। তাহলে সেটা আপনার দুঃসময়ে বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে বড় সাপোর্ট দেবে। আর সেটা সম্ভব হলে চারপাশের লোকজন এমনিতেই আপনাকে সমীহ করবে। দামী গাড়ি বা পোশাকের আবেদন ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ বৃদ্ধির আবেদন ক্রমবর্ধমান। তাই শুধু অর্থ নয়, সম্পদের ব্যাপারে মনোযোগী হোন।

© Md. Abdul Hamid (মো. আব্দুল হামিদ)। লেখকের অনুমতি ছাড়া এই সাইটের লেখা অন্য কোন মিডিয়ায় প্রকাশ করা যাবে না।

Follow Me

error

করোনা সতর্কতায় কোন ছাড় নয়, প্লিজ