ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ — ৬
ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ হলো নেতৃত্ব

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ — ৬

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ বিষয়ক আলোচনার ষষ্ঠ পর্ব। আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Asset # 6 : Incomparable Leadership Skills

বিষয়টা কখনো ভেবেছেন? আমাকে কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে ভাবায়…সেটা হলো:

বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা কিংবা সাধু বাবা সম্পর্কে সমাজে বহুত নেতিবাচক কথা চালু থাকার পরেও অগণিত মানুষ কেন তাদের ভক্ত হয়? অনুসারীরা তাদের জন্য অকাতরে অর্থ-মেধা-শ্রম-সময় ইত্যাদি বিনিয়োগ করে। অথচ তাদের সংস্পর্শে যাওয়ার ব্যাপারে (সিস্টেম বা আইনগত) কোন বাধ্যবাধকতা নাই। তবুও মানুষ কেন তাদের ভক্ত বনে যায়?

অপরদিকে, শিক্ষকমণ্ডলী এবং মসজিদের ইমামগণ প্রাতিষ্ঠানিক বিধি মোতাবেক নিয়মিতভাবে বিপুল সংখ্যক অনুসারী পান। এই মানুষগুলো দীর্ঘসময় তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও মতামত সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ পান। তারপরও কেন দীর্ঘমেয়াদে তাদের (অধিকাংশের) খুব একটা ভক্ত বা অনুসারী তৈরি হয় না?

ব্যবসায়ে নেতৃত্বের গুণাবলী

Robert T. Kiyosaki এর লেখা The Business of the 21st Century বইটা পড়তে গিয়ে এই প্রশ্নের কিছুটা জবাব পেলাম। যদিও তিনি ব্যবসায় চর্চায় সেগুলো বর্ণনা করেছেন। আমি তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে মেলাতে চেষ্টা করলাম মাত্র। তাঁর মতে, Money does not go to the business with the best products or service. Money flows to the business with the best leaders.

অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের আসনে বসা অধিকাংশ ব্যক্তিরই নিজেদের ফিল্ডে (একাডেমিক বা ধর্মীয়) ভালো জ্ঞান বা দক্ষতা থাকলেও নেতৃত্বের গুণাবলী বিষয়ে যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে। এমনকি তাদের সিংহভাগ সেটার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন না। ফলে মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের কথা শুনলেও হৃদয় ছুঁয়ে যায় না!

আরেকটা বিষয় এখানে কাজ করতে পারে। সেটা হলো: এমন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ বিষয়ে নিতান্তই ব্যাখাদানকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি। অর্থাৎ আলোচ্য বিষয়ে অমুক কী বলেছেন, তমুক কী মতামত দিয়েছেন– সেগুলো ব্যাখ্যা করেই তৃপ্ত বোধ করি। কিন্তু নিজে একজন থট লিডার হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি না। বিশেষজ্ঞদের তত্ত্ব বা মডেলকে ব্যাখা করে বর্তমান প্রেক্ষিত ও বাস্তবতায় নিজস্ব দর্শন হাজির করার সাহস পাই না!

একেবারে তা হয় না, ব্যাপারটা তেমন নয়। তবে তাদের সংখ্যা খুব কম। আর সে কারণেই দেখা যায় হাতে গোনা দু’চারজন ব্যক্তি– তেমন মর্যাদার আসন লাভ করেন। তাদের অনুসারীরা অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন। দুটো কথা শোনা বা সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য উন্মুখ হন। ফলে কাঠামো নির্ধারিত পজিশন নয়, নেতৃত্বের গুণাবলী নির্ধারণ করে– অনুসারীরা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে।

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

যাহোক, ফিরে আসি ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ বিষয়ক আলোচনার ষষ্ঠ ধাপে। রবার্ট কিয়োসাকির মতে, অতুলনীয় নেতৃত্বের দক্ষতা হলো কোন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অতি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আমাদের দেশে অতিসফল উদ্যোক্তাদের সিংহভাগই শুরু করেছিলেন খুব সামান্য পুঁজি নিয়ে। এমনকি ভিক্ষুক মহিলাদের নিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠান টিএমএসএস এখন বছরে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করে! এটা কী শুধু প্রচলিত ব্যবসায়ের মুনাফার কিউমিলিটিভ রূপ দিয়ে সম্ভব?

প্রকৃত নেতৃত্বের গুণাবলী হলো– নিজের ভাবনাকে অন্যদের মধ্যে সঞ্চারিত করা। অর্থাৎ নিজস্ব ভাবনা ও দর্শন অন্যদের মাঝে এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যেন তারাও তেমনটা বিশ্বাস করে এবং সেটার বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করার প্রেরণা পায়।

ব্যবসায়ের প্রকৃত সম্পদ হলো নেতৃত্ব

তাছাড়া নেতৃত্বের গুণাবলী অন্য সকল বৈশিষ্ট্যকে একবিন্দুতে মিলিত করে। লেখক এক্ষেত্রে জন এফ কেনেডির ভিশন এবং তা সংশ্লিষ্টদের মাঝে ট্রান্সমিট করার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি ১৯৬১ সালে এক বক্তৃতায় হঠাৎ করেই ঘোষণা করেন: আমরা এক দশকের মধ্যেই চাঁদে পা রাখতে যাচ্ছি! অথচ সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা তখনও এ-বিষয়ে তেমন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। এ-কথা বলার মাত্র তিন বছরের মাথায় (১৯৬৪ সালে) তিনি খুন হন। তাছাড়া সেই দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধেও মার্কিনীরা নাস্তানাবুদ হয়। তারপরও ১৯৬৯ সালে তাদের চন্দ্রাভিযান সফল হয়!

অর্থাৎ নেতা নিজের স্বপ্ন ও দর্শন এমনভাবে সংশ্লিষ্টদের মাঝে ইনজেক্ট করবেন যেন তার শারীরিক অনুপস্থিতি লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে না পারে। আমাদের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ-প্রসঙ্গে কিয়োসাকি বলেছেন, Genuine leaders can move mountains. অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে (তথ্য বা যুক্তিতে) যা অসম্ভব বা অকল্পনীয় মনে হয়, অনুসারীদের নিয়ে তিনি সেটাও অর্জন করতে সক্ষম হন।

লেখক মহানবী (সা), যিশু খ্রিস্ট, গৌতম বুদ্ধ, মাদার তেরেসা, মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ টেনে বলেছেন, তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন সময়, সমাজ ও প্রেক্ষিতের প্রতিনিধিত্ব করলেও তাদের মধ্যে কমন যে বৈশিষ্ট্য ছিল সেটা হলো: নিজেদের ভাবনা তাঁরা অনুসারীদের সাথে এমনভাবে কমিউনিকেট করতেন যে, সবাই তা দেখতে পেত এবং কথাগুলো তাদের আত্মাকে স্পর্শ করত।

ব্যবসায়ে সফল হবার ক্ষেত্রেও এই কথাটি প্রযোজ্য। মানুষ হিসাবে একজন ব্যক্তির সামর্থ্যর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু তিনি যদি নিজের ভাবনা অন্যদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করাতে সক্ষম হন তবে অনেকে মিলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ সহজ হয়ে যায়। বিস্ময়করভাবে আমাদের চারপাশে অধিকাংশকেই ‘ম্যানেজমেন্ট স্কিল’ অর্জনে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কিন্তু সত্যিকারের পার্থক্য সৃষ্টি করে লিডারশীল স্কিলস!

ব্যবসায়ে নেতৃত্ব

আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘কর্মী’ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে, নেতা নয়। কারণ শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বের চারটি প্রধান গুণাবলীর মধ্যে মাত্র একটিতে ফোকাস করা হয়। সেটা হলো: মানসিক সামর্থ্যর উন্নয়ন। অর্থাৎ একটা বিষয় বুঝে (বা মুখস্ত করে), প্রয়োজনীয় জায়গায় সেটা রি-প্রোডিউস করায় দক্ষতা বাড়ানো হয়। কিন্তু একজন নেতাকে আরও তিনটা (spirit, body, emotions) বিষয়ে সামর্থ্য অর্জন করতে হয়।

নেতৃত্ব বিষয়ে বহুল প্রচলিত একটা ভুল ধারণা রয়েছে। সেটা হলো– জনপ্রিয়তা দিয়ে নেতার সফলতা বা ব্যর্থতা পরিমাপ করা। কিন্তু এই অধ্যায়ে এ-ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে সাময়িক জনপ্রিয়তা আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না। তাই টিমের সদস্যদের কাছে প্রিয় হওয়ার চেয়ে আস্থাশীল ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা– বেশি দরকারী। অনুসারীদের এটা গভীরভাবে অনুভব করতে হবে যে, আপনি আসলে কী চান এবং সেটা অর্জনে (প্রয়োজনে) কতটা কঠোর হতে পারেন!

Follow Me

error

করোনা সতর্কতায় কোন ছাড় নয়, প্লিজ