মার্কেটিংয়ে পেশাদার লোকের এত অভাব কেন…

মার্কেটিংয়ে পেশাদার লোকের এত অভাব কেন…

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত জরিপ মতে, বর্তমানে তরুণদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় বলে বিবেচিত দশটির মধ্যে ছয়টি পেশারই মাত্র ‘একযুগ আগেও’ অস্তিত্বই ছিল না! অর্থাৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা নিত্যনতুন কর্মসংস্থানের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে– তরুণরা সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে, অধিকাংশক্ষেত্রে সফলতাও পাচ্ছে। অথচ আজো আমরা কল্পনা করি, সদ্য-ভুমিষ্ঠ সন্তানটি বড় হয়ে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে! এখন থেকে ঠিক পঁচিশ বছর পরে সেই শিশুটি পেশা গ্রহণের সময় পৃথিবীতে আরো কতো বিচিত্ররকম (এবং আকর্ষণীয়) পেশার উদ্ভব হবে– তা কি আমরা কল্পনাও করতে পারি?

আজ যারা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর এক্সিকিউটিভ কিংবা বেসরকারি ব্যাংকের বড়কর্তা– তারা কী স্কুলে পড়ার সময় কল্পনাও করতে পেরেছিলেন যে, ভবিষ্যতে এমন একটা পেশায় জড়িয়ে পড়বেন? বর্তমান পেশায় তারা কী খুব খারাপ আছেন; নাকি তাদের জীবন ব্যর্থ হয়ে গেছে? মোটেই না, বরং এখনকার অসংখ্য শিক্ষার্থী নিজেদের তৈরি করছে সামনের দিনে উল্লেখিত পেশাগুলোতে প্রবেশের জন্য। তাই পেশা নিয়ে স্বপ্ন বা পরিকল্পনা থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে তা বদলায় এবং মানুষ দক্ষতার সাথে নিজেকে মানিয়েও নেয়।

আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের শেখাই– পণ্যের চাহিদা সম্পর্কে উৎপাদনকারীর সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অতীব জরুরি। তাছাড়া পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও চাহিদা যেন হ্রাস না পায়– সে বিষয়ে সদা সতর্ক থাকতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে দ্রব্য ও সেবায় নিত্যনতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করা হয়– ঠিক এ কারণেই। অথচ বিজনেস গ্র্যাজুয়েট উৎপাদনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো কী নিজেদের পণ্যের (গ্র্যাজুয়েটদের) প্রত্যাশিত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ ও পারফরমেন্স মূল্যায়ন করছে? নিয়োগকর্তাদের ফিডব্যাক নিয়ে নিজেদের সেবার মান উন্নয়নে তৎপর রয়েছে? যদি তা ‘না’ হয়; ভবিষ্যতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে নাতো?

আরও জানতে ক্লিক করুন এখানে… 

সেদিন নামকরা এক প্রতিষ্ঠানের বড়কর্তা হতাশার সুরে বলছিলেন, আধুনিক ডিগ্রীধারীদের প্রতি আমাদের ‘প্রত্যাশা’ থাকে অনেক। কিন্তু বাস্তবে খুব একটা পার্থক্য চোখে পড়ে না। হতে পারে ভার্সিটিগুলোর নির্বিচারে বিবিএ প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তি করা, পরিবারের চাপে (পছন্দ না হলেও) শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে পড়তে আসা, লেকচার নির্ভর ও সেকেলে শিক্ষণ প্রক্রিয়া, বাস্তব জগতের সাথে অ্যাটাচমেন্টের সীমিত সুযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘মানসম্মত শিক্ষা’ বিষয়ে উদাসীনতা– ইত্যাদি কারণেই আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের মান কাংখিত পর্যায়ের হচ্ছে না।

মার্কেটিং পেশা উল্লেখিত পরিস্থিতিগুলোর মোটেই ব্যতিক্রম নয়। তাছাড়া এই পেশায় আসার পর– প্রথম কিছুদিন খুব সংগ্রাম করতে হয়। ছাত্রজীবনে তুলনামূলকভাবে আরামের জীবনযাপন, ইচ্ছামতো চলাফেরা থেকে হঠাৎ করে মার্কেটিং পেশায় আসলে– খাপ খাওয়াতে বেশ কষ্ট হয়। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে– দ্রুত এখান থেকে পালানোর। ফলে দীর্ঘদিন এই পেশায় থাকা লোকদের সংখ্যা বেশ কম। তবে যারা প্রাথমিক ধাক্কা সহ্য করে কিছুদিন টিকে থাকতে পারে এবং শিখতে আগ্রহী হয়– তারা দ্রুত সফলতা পেতে থাকে। আর্টগুলো একবার রপ্ত হয়ে গেলে, তারা কাজটাকে দারুণভাবে উপভোগ করে। খুব সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশে এই জাতীয় মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

অপরদিকে, আমাদের দেশে পূর্ববর্তী প্রজন্মের পেশাগত জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যাওয়ার ধারাও নেই বললেই চলে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বক্তৃতা, বিতর্ক, রচনা লেখা ও সাধারণজ্ঞান বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য যে নিরলস পরিশ্রম করেছি, যতটুকু শিখেছি– কর্মজীবনে আসার পর সেগুলো পরবর্তী প্রজন্মকে দেওয়ার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে! অথচ আমার কৌশল, দক্ষতা ও উপলব্ধিগুলো হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকলে তাদের আবার ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া লাগত না। বরং এগুলোর ওপর ভিত্তি করে সামনে এগোতে পারত। এই ধারা আছে বলেই শিল্পোন্নত দেশগুলোতে এত সৃষ্টিশীল কাজ হয়, নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত পায়।

এটা যে দারুণ ফল দেয় তার দৃষ্টান্ত হলো– আমাদের ক্রিকেটাঙ্গন। এই খেলাতে তুলনামূলকভাবে এই চর্চাটা একটু বেশি। আমাদের সময়ের ‘হিরোদের’ (ফারুক, আতাহার, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আকরাম, খালেদ মাহমুদ সুজন, নান্নুসহ অনেককেই) দেখি ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট নানা কার্যক্রমে নিবিড়ভাবে কাজ করতে। এভাবে অন্যান্য সেক্টরে সিনিয়রদের সংশ্লিষ্ট করা গেলে– হয়তো সেগুলোতেও উল্লেখ করার মতো সফলতা আসত। সেটা করতে হলে সবকিছুকে ‘রাজনীতির চোখে’ না দেখে প্রকৃত মেধাবী, দক্ষ ও অভিজ্ঞদের সাথে উঠতি প্রজন্মের সংযোগ ঘটাতে হবে। মার্কেটিংয়েরক্ষেত্রেও একথা একইভাবে প্রযোজ্য।

Leave a Reply

Follow Me

error

করোনা সতর্কতায় কোন ছাড় নয়, প্লিজ