বর্ষবরণের একাল সেকাল
বর্ষবরণের একাল সেকাল

বর্ষবরণের একাল সেকাল

Summary:

Wafer cake sweet roll cheesecake ice cream gingerbread sweet. Wafer gingerbread apple pie cotton candy jelly. Toffee oat cake oat cake toffee tootsie roll muffin sugar plum.

সেদিন পাশের সিটে বসা এক তরুণ ফোনে অপরপ্রান্তের মানুষটিকে জিজ্ঞাসা করছে — দোস্ত, পহেলা বৈশাখ কত তারিখে? সম্ভবত তার বন্ধুটি মজা করে বলেছে কেন বৈশাখ মাসের এক তারিখে! সে হালকা রেগে প্রত্যুত্তরে বলল — আরে ব্যাটা, এপ্রিল মাসের কয় তারিখ সেইটা বল! এ বিষয়ে তার কেন এতো আগ্রহ তা জানা গেল পরের বাক্যে। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে নববর্ষের অনুষ্ঠানে এক মডেল নাকি ড্যান্স করবে যার টিভি বিজ্ঞাপনও অশ্লীলতার দায়ে ইতিপূর্বে নিষিদ্ধ হয়েছিল। আইটেম গানের এই মডেলের ইউটিউব ভিডিও শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সুপারিশ করা হয়!

পরে ছেলেটির সাথে কথা বলে আরো জানলাম, আমেরিকান একটা ব্যন্ড দল সেখানে পারফর্ম করবে। দেশীয় যে ব্যন্ডগুলোর কথা বলল সেগুলোও সব ইংরেজি নামের। কোনো বাউল শিল্পী থাকবে কিনা জানতে চাইলে বলল সে জানে না– এ ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ আছে বলেও মনে হলো না! এ থেকে বোঝা যায় দেশের বড় একটা কোম্পানীর পৃষ্ঠপোষকতায় যে অনুষ্ঠান সেখানেই শেকড়ের নাচ-গানের ঠাঁই নাই; তাহলে বিদেশী কোম্পানীগুলোর স্পন্সরে আয়োজনগুলো কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।

চুলে পাক ধরলেও স্মৃতিচারণ করার মতো যথেষ্ঠ বয়স সম্ভবত এখনো হয়নি। মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে বটে তবুও ছোটবেলায় দেখা পাড়া-গাঁয়ের ঘটনাগুলো মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখি ইতিমধ্যে ত্রিশের বেশি বার বদলে গেছে দেয়ালের ক্যালেন্ডার, বাড়ীর পাশে বহমান পদ্মায় গড়িয়েছে অনেক জল। গ্রামের মেঠো পথ ক্রমেই হয়েছে পিচঢালা, খড়ের ঘরের জায়গা নিয়েছে সুদৃশ্য সব দালান, আর আমাদের অগোচরে তথ্যপ্রযুক্তির কাঁধে চেপে গ্রাম্য বৈশাখী আয়োজনগুলো চলে গেছে কর্পোরেট জায়ান্টদের হাতে। ফলে একালে বৈশাখী অনুষ্ঠানমালার বাহ্যিক জৌলুস বাড়লেও কমেছে সেকালের আত্মিক সম্পর্ক, নিষ্কলুস বোধ ও অকৃত্রিম তৃপ্তির জায়গা।

উদযাপনে ভিন্নতা থাকলেও প্রায় সব জাতিই নিজ নিজ নববর্ষকে উৎসবমূখর পরিবেশে বরণ করে। যতোদূর জানা যায় – পারস্যের ‘নওরোজ’ হলো প্রাচীনতম এবং সাতদিনব্যাপী উদযাপিত নববর্ষের অনুষ্ঠান। আমাদের দেশেও কম-বেশি তিনটি নববর্ষ পালিত হয়। বিশ্বব্যাপী প্রচলিত এবং কর্মক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত বলে ইংরেজি নববর্ষ সম্পর্কে সবাই অবহিত এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একাংশের মাঝে সাড়ম্বরে তা উদযাপনের প্রবণতা দেখা যায়।
অপরদিকে রোজা, ঈদ, হজ্জ্ব, আশুরার মতো অনুষ্ঠানমালার নিবিড় সম্পর্ক থাকায় সচেতন মুসলমানরা হিজরী নববর্ষের খোঁজখবর রাখেন। তবে তা ঘটা করে উদযাপনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। অপরদিকে বাঙলা নববর্ষে সকল পেশা, অঞ্চল, ও সংস্কৃতির মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এছাড়াও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা বৈসুখ, সাংগ্রাই, বিজু (একত্রে বৈসাবি) ইত্যাদির মতো নববর্ষ অনুষ্ঠানগুলো দেশের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে বর্ণিল আয়োজনে উদযাপন করে থাকে।

বাঙলা নববর্ষ বিষয়ক একটা প্রশ্ন দীর্ঘদিন যাবত মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেটা হলো – পহেলা বৈশাখ কীভাবে সবার উৎসব হলো? অর্থাৎ এই আয়োজনে সবাই যুক্ত হবার সূত্রটা কোথায়? যেকোনো উৎসবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধর্ম, রীতি, প্রথা কিংবা মিথ অনুযায়ী তার অনুসারীরা বিশেষ কিছু আচার-অনুষ্ঠান চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়। তাহলে বাংলা নববর্ষের ক্ষেত্রেও কী তেমন কিছু আছে? পড়াশোনা করে ও অভিজ্ঞদের মতামত থেকে এটুকু বুঝলাম – অর্থ ও বাণিজ্যের বিষয়গুলোই সর্বস্তরের বাঙালিকে সংশ্লিষ্ট করেছে নববর্ষের আয়োজনে।

তাই এখনকার চর্চা যাই হোক না কেন শুরুটা হয়েছিল শাসকদের খাজনা আদায়, মহাজনদের হালখাতা, আর সমৃদ্ধ গ্রাম্য মেলাকে কেন্দ্র করে। আমাদের পূর্বপুরুষরা এগুলোর এক বা একাধিক বিষয়ে জড়িত থাকত বলেই এই দিনটি তাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ধরা দেয়। উৎসবপ্রিয় জাতি হিসাবে আমরা এখন ব্যাপকভাবে এতে অংশগ্রহণ করছি; ক্রমেই বাংলা নববর্ষ হয়ে উঠছে বাঙালির প্রাণের উৎসব।

একসময় অগ্রহায়ণ ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস। সেটা ছিল প্রজাদের খাজনা পরিশোধের সময়। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার মৌসুম না হওয়ায় কৃষকদের জন্য তা হতো খুবই কষ্টসাধ্য। তাই সম্রাট আকবর গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে ‘ফসলি সন’ চালু করেন। বঙ্গ দেশের জন্য প্রবর্তন করায় এর নাম হয় বঙ্গাব্দ যার প্রথম মাস বৈশাখ। এই মৌসুমে মানুষের হাতে টাকা আসতো বলে মহাজনরাও হালখাতার জন্য এই সময়টিকে বেছে নেয়। সাজ সাজ রবে খাজনা আদায়ের আয়োজন ও হালখাতার প্রক্রিয়ায় সমাজের সব শ্রেণীর লোকই সংশ্লিষ্ট হতো। তখন শাসক ও মহাজনদের মেজাজ থাকতো ফুরফুরে। ফলে তারা আগতদের জন্য তৃপ্তিদায়ক ভোজ ও বিনোদনের আয়োজন করত; অনেকক্ষেত্রে উপহারসামগ্রী দেয়ার প্রচলনও ছিল। নতুন পোশাকে গণমানুষের চলাচল গ্রামগুলোকে করতো বর্ণিল ও প্রাণচঞ্চল।

বর্ষবরণের একাল সেকাল

দিনটাকে আরো আনন্দময় করে তুলতে কয়েক গ্রামের মধ্যবর্তী কোনো মাঠে, ঐতিহাসিক স্থানে কিংবা বড় গাছের নীচে বসত বৈশাখী মেলা। সে মেলায় সাধারণত গ্রাম্য কারিগরদের হাতে তৈরি নানা তৈজসপত্র, খেলনা ও মিষ্টান্ন পাওয়া যেত। সাথে থাকত চড়ক পুজা ও নাগরদোলা। সববয়সী মানুষেরা বছরের এই দিনটিতে পেত নির্মল বিনোদন। অনেক জায়গায় সন্ধ্যা পর বসত লোকজ-বাউল গানের আসর। সমাজের ধনী-দরিদ্র সবাই মাটিতে বসে রাতভর তা উপভোগ করত। খেটে খাওয়া মানুষগুলো মুগ্ধ হয়ে পুঁথিপাঠ, কবিয়ালদের বাহাস, আর বাউলদের গান শুনত। আধ্যাত্মিক গানের কথা ও সুরে মানুষের সীমাবদ্ধতা, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া, পরকাল ইত্যাদির মতো জটিল বিষয়গুলো সাবলীলভাবে উঠে আসত। ফলে বছরের এই দিনটি সমাজের সবস্তরের মানুষের ভেদাভেদ ভুলে হয়ে উঠত নতুনভাবে পথচলার দারুণ উপলক্ষ।

তখন চৈত্র-সংক্রান্তিকেও বেশ গুরুত্ব দেওয়া হতো। কৃষক তার গোলার ধান, গোয়ালের গরু এবং কৃষি সরঞ্জামাদিকে অমঙ্গলের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং কল্যাণকর নতুন বছর পাবার প্রত্যাশায় ঘরোয়া নানা আয়োজন করত। গরুকে গোসল করিয়ে শিং ও খুরে তেল মাখানো, কলাপাতায় মুড়ে মুঠি খাওয়ানো ছিল পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের আগের আনুষ্ঠানিকতা। তাছাড়া নতুন লাঙল বাঁধা, কাপড়ে ধান বেঁধে ঘরে ঝুলিয়ে রাখার কাজগুলো করা হতো গোটা বছর সুখে-শান্তিতে কাটাবার আশায়।

শুভ দিনে শখ করে ‘পান্তা খাওয়া’র ব্যাপারটি আমাদের এলাকায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। গরম কালে সারারাত ভাত রেখে দিলে নষ্ট হবার ভয়ে মানুষ পানি দিয়ে রাখত। তাছাড়া পান্তার সাথে ‘ইলিশ’ মাছের বিষয়টি একেবারেই ছিল না। কারণ সে সময় গ্রামের খুব কম মানুষই ইলিশ মাছ খাবার সামর্থ্য রাখত। আর যারা ইলিশ কিনতে পারত তারা পান্তা খেত না! গরীব-দুখীদের পান্তার সাথে একটু নুন ও কাঁচা লঙ্কা হলেই মহা খুশি হতো। সাথে একটু পেঁয়াজ জুটলেতো কথাই নেই, অমৃত জ্ঞানে কয়েক সানকি সাবাড় করে দিত।

কর্পোরেট কালচারের যুগে দিন আসলেই বদলায়া গ্যাছে। আগে বাচ্চারা টাউনে বেড়াতে গেলে তা হতো গর্বের বিষয়; এখন হয় গ্রামে গেলে। ঠিক তেমনি গ্রাম্য কৃষকদের বৈশাখী উৎসব এখন শহুরে মানুষদের জীবনে বয়ে এনেছে সুখের উপলক্ষ। দৈনন্দিন যান্ত্রিক জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষগুলো একদিনের জন্য হলেও বাঙালি হবার প্রত্যয়ে রাস্তায় নামে। কিন্তু তপ্ত রোদ আর প্রচন্ড যানজট তাদের নাকাল করে দেয়। তাছাড়া মানুষের আর্থিক সামর্থ্য বাড়ার সাথে সাথে তারা কোম্পানীগুলোর টার্গেটে পরিণত হয়েছে। একই ব্যক্তির কাছে বারবার পণ্য বিক্রির লক্ষ্যে প্রতিটি অনুষ্ঠানের পোশাকের রং করা হয়েছে ভিন্ন যেন পহেলা ফাল্গুনের পোশাকটি আর পহেলা বৈশাখে না চলে! বাংলা নববর্ষে বিশেষায়িত পোশাক, ফুল, উপহারসামগ্রী দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। আর পান্তা ইলিশের ব্যবসায়িক সফলতা — সেতো টক অব দ্যা কান্ট্রি।

বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানীগুলো এগিয়ে আসায় ব্যাপক পরিসরে অনুষ্ঠানগুলো করা সম্ভব হচ্ছে। শহর-গ্রাম সর্বত্র মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ বাড়ছে। সরকারের তরফ থেকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধ্যমতো অনুষ্ঠানমালা আয়োজনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন ইতিমধ্যে জাতীয় অনুষ্ঠানের রূপ লাভ করেছে। কিন্তু পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত কনসার্টে হিন্দি ও ইংরেজি গান পরিবেশন, ঐসকল ভাষার গানের সাথে অশ্লীল ড্যান্স, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও ইমেইল-মেসেজে বাংলিশ ভাষায় অবাধ ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে।

সেদিন দেখলাম দেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের নববর্ষ আয়োজনের পোস্টারটিও করা হয়েছে ইংরেজি ভাষায়! আয়োজকরা হয়তো কোল্ডড্রিংকস, বার্গার কিংবা পিৎজা পরিবেশন করে সগৌরবে গেয়ে উঠবে ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে’। তাছাড়া এই জাতীয় অনুষ্ঠানে ইদানিং নানা হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে; এটা আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না। তাই নববর্ষে যারা এগুলো করে তারা বাঙালির কোন বোধই ধারণ করে না। একদিনের জন্য তারা পান্তা খেলো নাকি সাদা পাঞ্জাবি পরলো — তাতে কি কিছু এসে যায়?

হায়দার হোসেন তার স্বাধীনতা গানে খুব যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন রেখেছেন ‘স্বাধীনতা কি বৈশাখী মেলা, পান্তা ইলিশ খাওয়া/স্বাধীনতা কি বটমূলে বসে বৈশাখী গান গাওয়া’? শেষে তিনি যে জায়গাটায় মনযোগ আকর্ষণ করেছেন সেটা হলো– আমরা গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়কে আনুষ্ঠানিকতায় বন্দী করে ফেলেছি। অথচ তার গভীরে যে শিক্ষা রয়েছে সেটা নিয়ে ভাবতে চাই না, লালন করি না; যা জাতি হিসাবে আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ করছে। তাই এবারের বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটুক; সবার মাঝে সত্যিকার বাঙালি সংস্কৃতির বোধ জাগরুক হোক। নতুন বছর ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বোপরি মানবতার কল্যাণ বয়ে আনুক।

ভালো লাগলে বন্ধুদের বলুন, মন্দ লাগলে আমাদের জানান

Leave a Reply

Follow Me

আপনার মস্তিষ্কের মালিকানা বুঝে নিন…

মস্তিষ্কের মালিকানা
error

করোনা কিন্তু করুণা করে না!!!

mahamid.biz@gmail.com
WhatsApp